বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন অনেক শিল্পী আছেন, যাঁদের অবদান আজও দর্শকের মনে অমলিন। পর্দায় তাঁরা কখনও হাসিয়েছেন, কখনও আবার গভীর আবেগে ছুঁয়ে গেছেন দর্শকদের। বাংলা সিনেমার সেই স্বর্ণযুগে এক উজ্জ্বল নাম ছিল সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়(Satya Bandyopadhyay)। প্রায় তিনশোরও বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন শক্তিশালী চরিত্রাভিনেতা হিসেবে। তবে এই সাফল্যের আড়ালে লুকিয়ে ছিল কঠিন সংগ্রাম, আর জীবনের শেষদিকে ছিল এক অদ্ভুত নিঃসঙ্গতা।
১৯২৫ সালে কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর পিতা বনমালী বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মাতা চারুশীলা দেবীর আদি বাড়ি ছিল হুগলি জেলায়। ছোটবেলায় পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলায় দারুণ পারদর্শী ছিলেন তিনি—ফুটবল ও ব্যাডমিন্টনে তাঁর বিশেষ সুনাম ছিল। কিন্তু অল্প বয়সেই মাকে হারাতে হয় তাঁকে। পরে সিটি কলেজে পড়াকালীন বাবার মৃত্যুও জীবনে বড় ধাক্কা দেয়। সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে কলেজ শেষ করে টিটাগড় পেপার মিলে মাত্র ৩২ টাকা বেতনে কেরানির চাকরি শুরু করেন তিনি। সেই সময় থেকেই শুরু হয় জীবনের কঠিন লড়াই।
অভিনয়ের প্রতি টান ছিল ছোটবেলা থেকেই। আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় নিয়মিত অংশ নিতেন এবং অফিসের কাজের ফাঁকে আহিরীটোলার একটি ক্লাবে নাটকের মহড়া দিতেন। এক অনুষ্ঠানে তাঁর অভিনয় দেখে মুগ্ধ হন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। তাঁর উৎসাহেই সত্য বন্দ্যোপাধ্যায় রেডিওতে অডিশন দেন। প্রথম দিকে বহুবার ব্যর্থ হলেও পরে সুযোগ পান। এরপর টানা পাঁচশোরও বেশি রেডিও নাটকে অভিনয় করেন তিনি। পাশাপাশি মিনার্ভা ও রংমহলের মতো নাট্যমঞ্চে “সাহেব বিবি গোলাম”, “আদর্শ হিন্দু হোটেল”, “চৌরঙ্গী”, “আসামী হাজির”সহ একাধিক জনপ্রিয় নাটকে অভিনয় করে দর্শকদের মন জয় করেন।
নাট্যমঞ্চের সাফল্যের হাত ধরেই তাঁর চলচ্চিত্রে প্রবেশ। স্বাধীনতার পরপরই প্রথমবার সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগ পান তিনি। এরপর ধীরে ধীরে বাংলা চলচ্চিত্রে নিজের জায়গা পাকাপোক্ত করেন। “বরযাত্রী”, “পাশের বাড়ি”, “মহাপুরুষ”, “নায়ক”, “বালিকা বধূ”, “চার মূর্তি”, “দাদার কীর্তি”-র মতো বহু জনপ্রিয় ছবিতে অভিনয় করেন তিনি। সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন ও তরুণ মজুমদারের মতো খ্যাতনামা পরিচালকদের ছবিতেও দেখা গেছে তাঁকে। কমেডি, ভিলেন কিংবা গভীর চরিত্র—সব ধরনের ভূমিকাতেই তিনি ছিলেন স্বতন্ত্র।
আরও পড়ুনঃ বিতর্কিত রাজনৈতিক নেতা থেকে এবার আইনরক্ষক! দুলাল দে’র ‘ফাঁদ’-এ দাপুটে পুলিশ অফিসারের চরিত্রে থাকছেন কুণাল ঘোষ! টলিপাড়ায় চর্চা তুঙ্গে, কবে শুরু শুটিং?
অভিনয়ের পাশাপাশি নাটক লেখা ও থিয়েটারের কাজেও গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়। উত্তম কুমারের স্মৃতিতে ‘উত্তম মঞ্চ’ তৈরির উদ্যোগেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে থিয়েটারের জনপ্রিয়তা কমতে থাকে, আর্থিক সমস্যাও বাড়ে। ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে পড়েন সত্যবাবু। জীবনের শেষ দিকে তিনি প্রায় একাকী হয়ে পড়েছিলেন। কাছের মানুষদের কাছে নাকি একসময় আবেগঘন কণ্ঠে বলেছিলেন—জীবনের এত লড়াই, এত কাজের পরও শেষটা যেন ভীষণ নিঃসঙ্গ। দীর্ঘ অসুস্থতার পর ১৯৯৭ সালের ২৮ জুলাই রাতে চিরবিদায় নেন বাংলা অভিনয় জগতের এই কিংবদন্তি। তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায় যেন মনে করিয়ে দেয়—মঞ্চ ও পর্দায় যাঁরা হাজার মানুষকে আনন্দ দেন, তাঁদের জীবনেও কখনও কখনও নেমে আসে গভীর নীরবতা।






