বুধবার দুপুরে আচমকাই টলিপাড়ায় ছড়িয়ে পড়ে এক ভয়াবহ খবর। গড়িয়াহাটের একটি বহুতল আবাসনের ছাদ থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন পরিচালক অনীক দত্ত। দ্রুত তাঁকে ঢাকুরিয়ার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও চিকিৎসকেরা শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাঁচাতে পারেননি। ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ খ্যাত এই পরিচালকের মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে আসে গোটা বাংলা চলচ্চিত্র জগতে। তবে ঘটনার পর থেকেই একের পর এক নতুন তথ্য সামনে আসতে শুরু করেছে। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, ঘটনার দিন তিনি নিজের প্রাক্তন স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু প্রাক্তন স্ত্রী তাঁর সঙ্গে দেখা করতে না চাইলে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন পরিচালক। তারপরই তিনি সোজা ছাদের দিকে চলে যান বলে পুলিশের অনুমান। আর সেই ঘটনার পর থেকেই তাঁর মৃত্যু ঘিরে তৈরি হয়েছে একাধিক প্রশ্ন।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ঘটনার সময় অনীক দত্তের প্রাক্তন স্ত্রী ওই ফ্ল্যাটেই উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু কোনও কারণে তিনি পরিচালকের সঙ্গে দেখা করতে রাজি হননি। তদন্তকারীদের অনুমান, সেই ঘটনার পর গভীর হতাশায় ডুবে যান অনীক। তিনি আর ফ্ল্যাটে প্রবেশ না করে সোজা বহুতলের ছাদে উঠে যান। সেখান থেকেই ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন বলে পুলিশের প্রাথমিক ধারণা। খবর পেয়ে গড়িয়াহাট থানার পুলিশ এবং লালবাজারের হোমিসাইড শাখার আধিকারিকরা ঘটনাস্থলে পৌঁছন। এরপরই আবাসনের CCTV ফুটেজ খতিয়ে দেখা হয়। সেই ফুটেজে দেখা যায়, অনীক দত্ত একাই ছাদের দিকে যাচ্ছেন। পুলিশের দাবি, ঘটনার সময় তাঁর আশেপাশে আর কাউকে দেখা যায়নি। ফলে এই ঘটনায় অন্য কারও উপস্থিতির সম্ভাবনা আপাতত উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
তদন্তে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এসেছে। ছাদে তল্লাশি চালিয়ে পুলিশ পরিচালকের একজোড়া চটি জুতো উদ্ধার করেছে। তদন্তকারীদের অনুমান, ঝাঁপ দেওয়ার আগে তিনি নিজেই জুতো খুলে রেখেছিলেন। ঘটনাদিনে নিজের গাড়ি করে সেখানে গিয়েছিলেন অনীক দত্ত। সঙ্গে ছিলেন তাঁর চালকও। পুলিশ সূত্রে খবর, ওপরে ওঠার সময় তিনি ড্রাইভারকে নিচে অপেক্ষা করতে বলেন। চালক বুঝতেই পারেননি যে, কয়েক মিনিটের মধ্যে এত বড় দুর্ঘটনা ঘটতে চলেছে। আচমকা বিকট শব্দ শুনে তিনি এবং আবাসনের অন্য বাসিন্দারা ছুটে গিয়ে দেখেন, রক্তাক্ত অবস্থায় নিচে পড়ে রয়েছেন পরিচালক। দ্রুত তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে মাথায় গুরুতর আঘাত এবং বুকের একাধিক পাঁজর ভেঙে যাওয়ায় শেষরক্ষা হয়নি।
ঘটনাস্থল থেকে একটি সুইসাইড নোটও উদ্ধার করেছে পুলিশ। সেখানে নিজের দীর্ঘদিনের মানসিক যন্ত্রণা এবং হতাশার কথা লিখে গিয়েছেন অনীক দত্ত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, সেই নোটে তিনি স্পষ্ট করে লিখেছেন, “তাঁর এই মৃত্যুর জন্য অন্য কেউ দায়ী নয়।” পুলিশ জানিয়েছে, এখনও পর্যন্ত কোনও অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র বা অস্বাভাবিক ঘটনার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। প্রাথমিক তদন্তে এটিকে অবসাদজনিত আত্মহত্যা বলেই মনে করা হচ্ছে। ঘনিষ্ঠ সূত্রের দাবি, দীর্ঘদিন ধরেই মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন পরিচালক। সেই কারণে তাঁকে নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ খেতে হত। যদিও তদন্ত এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি। সমস্ত দিক খতিয়ে দেখেই চূড়ান্ত রিপোর্ট তৈরি করবে পুলিশ।
আরও পড়ুনঃ ‘শিল্পের টুঁটি চি’পে ধরার চেষ্টা!’ মমতাকে দেখে ক্ষো’ভে ফেটে পড়েছিলেন অনীক দত্ত! তারপরই কি অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা? সেদিন পরিচালকের পাশে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদে সরব হয়েছিলেন বর্তমান তৃণমূল সাংসদ সায়নী ঘোষও! কী ঘটেছিল জানেন?
২০১২ সালে ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ সিনেমার মাধ্যমে বাংলা ছবিতে নতুন ধরণের ব্যঙ্গ ও সমাজচেতনার ভাষা এনেছিলেন অনীক দত্ত। তাঁর ছবি শুধু বিনোদন নয়, সমাজ ও রাজনীতির নানা দিক নিয়েও কথা বলত। কিন্তু পর্দার আড়ালে যে তিনি এত গভীর একাকীত্ব এবং মানসিক চাপে ভুগছিলেন, তা অনেকেই বুঝতে পারেননি। তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই হাসপাতালে ভিড় করেন টলিউডের বহু অভিনেতা, পরিচালক ও অনুরাগীরা। বাংলা সিনেমার এক গুরুত্বপূর্ণ নির্মাতাকে হারিয়ে শোকস্তব্ধ গোটা ইন্ডাস্ট্রি। অনেকেই মনে করছেন, তাঁর অসমাপ্ত ভাবনা এবং কাজ আগামী দিনেও দর্শকের মনে বেঁচে থাকবে। তবে এই আকস্মিক মৃত্যু যে বাংলা চলচ্চিত্র জগতে বড় শূন্যতা তৈরি করল, তা বলাই বাহুল্য।






