বাংলা গানের জগতে এক স্বতন্ত্র নাম অঞ্জন দত্ত (Anjan Dutt)। তিনি শুধু একজন গায়ক নন, একই সঙ্গে অভিনেতা, চলচ্চিত্র পরিচালক এবং গীতিকার হিসেবেও দীর্ঘদিন ধরে দর্শক-শ্রোতার মন জয় করে আসছেন। ১৯৫৩ সালের ১৯ জানুয়ারি কলকাতায় জন্ম নেওয়া অঞ্জন দত্ত বাংলা গানের ধারায় “জীবনমুখী গান”-এর অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে পরিচিত। নাগরিক জীবনের বাস্তবতা, মধ্যবিত্ত মানুষের টানাপোড়েন এবং ব্যক্তিগত আবেগকে তিনি সহজ ভাষায় গানে তুলে ধরেছেন, যার জন্য অনেকেই তাঁকে বাংলার “বব ডিলান” বলেও অভিহিত করেন।
চলচ্চিত্র জগতেও তাঁর অবদান কম নয়। ১৯৮১ সালে মৃণাল সেনের ‘চালচিত্র’ সিনেমার মাধ্যমে অভিনয়ে তাঁর যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীতে তিনি ‘দ্য বং কানেকশন’, ‘রঞ্জনা আমি আর আসব না’ এবং ব্যোমকেশ সিরিজের মতো কাজ পরিচালনা ও অভিনয় করেছেন। সম্প্রতি তিনি আবারও মৃণাল সেনের জীবন নিয়ে নির্মিত ‘চালচিত্র এখন’ ছবিতে কাজ করে আলোচনায় এসেছেন। তাঁর গান যেমন প্রজন্মের পর প্রজন্মকে প্রভাবিত করেছে, তেমনি তাঁর সিনেমাও বাংলা চলচ্চিত্রে এক আলাদা ধারা তৈরি করেছে।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে অঞ্জন দত্ত বর্তমান বাংলা চলচ্চিত্র ও বিনোদন জগৎ নিয়ে বেশ কড়া মন্তব্য করেছেন। তাঁর মতে, এখনকার সিনেমা জগতে প্রতিটি পরিচালকের নিজের আলাদা “সিগনেচার স্টাইল” বা স্বতন্ত্র পরিচয় ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। আগে যেমন কোনো সিনেমা দেখলেই বোঝা যেত সেটি কোন পরিচালকের কাজ, এখন সেই পার্থক্য অনেকটাই মুছে গেছে বলে তিনি মনে করেন। তাঁর অভিযোগ, আজকের দিনে সবাই একই ধরনের বিষয় নিয়ে কাজ করছে, বিশেষ করে ব্যোমকেশ বা ফেলুদার মতো থ্রিলারধর্মী কনটেন্টের প্রতি অতিরিক্ত ঝোঁক দেখা যাচ্ছে।
অঞ্জন দত্ত স্পষ্টভাবে জানান, তিনি মনে করেন বর্তমানে অনেকেই শুধুমাত্র ট্রেন্ড অনুসরণ করতে গিয়ে সিনেমার নিজস্বতা হারিয়ে ফেলছেন। তাঁর ভাষায়, এখন এক ধরনের প্রবণতা তৈরি হয়েছে যেখানে সবাই সব ধরনের সিনেমা বানাতে চাইছেন, কিন্তু নিজের আলাদা ভাষা বা স্টাইল তৈরি করার চেষ্টা কমে যাচ্ছে। এই কারণেই একটি সিনেমা দেখলে আর বোঝা যায় না সেটি ঠিক কোন পরিচালকের তৈরি, কারণ সেখানে আলাদা কোনো ছাপ বা পরিচয় থাকে না। তিনি আরও উল্লেখ করেন, এক সময় গৌতম ঘোষ, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত বা ঋত্বিক ঘটকের মতো পরিচালকদের নিজস্ব সিগনেচার স্টাইল ছিল, যা তাঁদের কাজকে আলাদা পরিচয় দিত।
এই প্রসঙ্গে তিনি কিংবদন্তি পরিচালক মৃণাল সেনের কথাও উল্লেখ করেন। অঞ্জন দত্ত বলেন, মৃণাল সেন কখনোই নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করার জন্য বা ট্রেন্ড অনুসরণ করার জন্য সিনেমা বানাননি। তিনি নিজের ভাবনা ও দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী কাজ করেছেন। কিন্তু আজকের দিনে সেই স্বাধীন সৃজনশীলতা অনেকটাই কমে যাচ্ছে বলে তাঁর মত। তাঁর মতে, চলচ্চিত্র নির্মাণ এখন অনেকটাই বাজারকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে, যেখানে সৃজনশীলতার চেয়ে জনপ্রিয়তার দিকে বেশি নজর দেওয়া হচ্ছে।
আরও পড়ুনঃ “নারীদের জন্য অসম্মানজনক, ওই গান আর গাইব না” নিজের মুখে বলেও ফের অনুষ্ঠানে ‘চিকনি চামেলি’ গাইতেই ট্রোলিংয়ের শিকার শ্রেয়া ঘোষাল! গায়িকাকে সমর্থন জানিয়ে কটাক্ষকারীদের কী কঠোর বার্তা পৌষালী ও লগ্নজিতার?
সবশেষে অঞ্জন দত্তের এই মন্তব্য আবারও বাংলা চলচ্চিত্র জগতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অনেকেই তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে একমত হলেও, কেউ কেউ মনে করছেন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সিনেমার ধারা বদলানো স্বাভাবিক। তবে অঞ্জন দত্তের মূল বক্তব্য স্পষ্ট,সিনেমার নিজের একটি স্বতন্ত্র পরিচয় থাকা জরুরি, নাহলে শিল্প তার মৌলিকতা হারিয়ে ফেলে।






