উত্তম কুমারের জীবনের শুরুর দিকটা আজকের মতো ঝলমলে ছিল না। একের পর এক বাধা পেরিয়ে তখন তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার লড়াইয়ে ব্যস্ত। সেই কঠিন সময়ে তাঁর পাশে থাকা মানুষগুলির মধ্যে এমন এক অভিনেত্রীও ছিলেন, যাঁর নাম আজ অনেকটাই বিস্মৃত। অথচ উত্তম কুমারের অভিনয়জীবনের একেবারে শুরুর ইতিহাসে তাঁর ভূমিকা কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।
১৯৪৯ সালে ‘দৃষ্টিদান’-এর পর মুক্তি পায় উত্তম কুমারের দ্বিতীয় ছবি ‘কামনা’। এই ছবিতেই তিনি প্রথম বড় লিড রোলে অভিনয়ের সুযোগ পান। তাঁর নায়িকা হিসেবে ছিলেন ছবি রায়। জানা যায়, ‘দৃষ্টিদান’-এ উত্তমের অভিনয় দেখে ছবি রায় তাঁকে পছন্দ করেছিলেন এবং তাঁর পরামর্শেই পরিচালক নবেন্দু সুন্দর বন্দ্যোপাধ্যায় উত্তম কুমারকে ‘কামনা’য় কাস্ট করার সিদ্ধান্ত নেন। সেই সময় একাধিক জায়গায় ঘুরে কাজের সুযোগ খুঁজতে থাকা উত্তমের জন্য এই সুযোগ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
‘কামনা’র পর অবশ্য ছবি রায়ের অভিনয়জীবন থেমে থাকেনি। নিউ থিয়েটার্সের ‘মাই সিস্টার’ থেকে ‘স্পর্শমণি’, ‘ওগো শোনো’, ‘মিথুন লগ্ন’, ‘শ্রাবণ সন্ধ্যা’, ‘সহযাত্রী’, ‘অপরাজিতা’, ‘মন্ত্রমুগ্ধ’ এবং ‘রামের সুমতি’র মতো একাধিক ছবিতে তাঁকে দেখা যায়। এমনকী সুচিত্রা সেনের ডেবিউ ছবি ‘সাত নম্বর কয়েদি’তেও তিনি একটি সহায়ক চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। সমসাময়িক স্মৃতিকথায় তাঁর সৌন্দর্য ও ব্যক্তিত্বের উল্লেখও পাওয়া যায়। কিন্তু উত্তম কুমারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের গল্পেই রয়েছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
আরও পড়ুন: “তখন আমি কিচ্ছু না, আমরা গল্প করতাম দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে…” দুধ আনতে গিয়ে রোজ দেখা হত জয়া বচ্চনের দাদুর সঙ্গে! প্রয়াত অভিনেতা তাপস পালের মুখেই শোনা গেছিল সেই দিনগুলির কথা! কীভাবে গোয়ালার লাইনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই গড়ে উঠেছিল তাঁর পরিচয়?
উত্তম তখনও প্রতিষ্ঠিত নায়ক নন। অন্যদিকে প্রদীপ কুমার ইতিমধ্যেই পরিচিত মুখ। পুরনো নাট্যজগতের সম্পর্কের সূত্র ধরে উত্তম কুমার প্রদীপ কুমারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে গেলে তিনি তাঁকে চিনতে পারেননি। ঘটনাটি উত্তমকে কষ্ট দিয়েছিল বলে জানা যায়। সেই সময় ছবি রায় তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বোঝান, সাফল্যের সঙ্গে অনেক সময় মানুষের আচরণও বদলে যায়। কিন্তু সেই অপমানকে উত্তম কুমার মনে পুষে রাখেননি। বরং বহু বছর পর নিজের প্রযোজিত ‘গৃহদাহ’ ছবিতে প্রদীপ কুমারকে অভিনয়ের সুযোগ দেন।
আর এখানেই সামনে আসে উত্তম কুমারের ব্যক্তিত্বের এক অন্য দিক। যাঁরা তাঁর শুরুর দিনের সংগ্রামে পাশে ছিলেন, তাঁদের তিনি সাফল্যের পরেও ভুলে যাননি। সেই তালিকায় অন্যতম ছিলেন তাঁর প্রথম দিকের সহ-অভিনেত্রী ছবি রায়। একসময় উত্তম কুমারের সঙ্গে পোস্টারে তাঁর নাম ছিল, আজ সেই মুখটিই অনেকের কাছে অচেনা। তাই ১৯৪৯-এর ‘কামনা’র সেই অভিনেত্রীকে নতুন করে মনে করার সময় এসেছে তিনি ছিলেন ছবি রায়, যাঁর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মহানায়কের শুরুর দিনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।






