বিনোদন জগতের ঝলমলে আলো, তারকাদের সাফল্য আর জনপ্রিয়তার আড়ালে লুকিয়ে থাকে অসংখ্য ছোট-বড় গল্প। শুটিং ফ্লোরে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা সেই মুহূর্তে যতই সাধারণ মনে হোক না কেন, সময়ের সঙ্গে সেগুলোই হয়ে ওঠে স্মৃতির ভাণ্ডারের অমূল্য সম্পদ। বহু বছর পরে সেইসব গল্প ফিরে এলে দর্শকরাও যেন নতুন করে চিনতে পারেন তাঁদের প্রিয় শিল্পীদের। বাংলা সিনেমার স্বর্ণযুগের নেপথ্যেও ছড়িয়ে রয়েছে এমন অসংখ্য মজার, অবাক করা এবং মানবিক ঘটনা, যা আজও সমান আগ্রহ নিয়ে শোনেন সিনেমাপ্রেমীরা।
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সুচিত্রা সেন শুধু একজন অভিনেত্রী নন, তিনি এক কিংবদন্তি। পর্দায় তাঁর উপস্থিতি যেমন দর্শকদের মুগ্ধ করত, তেমনই শুটিং ফ্লোরেও ছিল তাঁর আলাদা ব্যক্তিত্ব ও নিজস্ব নিয়মকানুন। কাজের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অত্যন্ত খুঁতখুঁতে। পোশাক, মেকআপ কিংবা খাবার প্রতিটি বিষয়ে তাঁর নিজস্ব পছন্দ ছিল। প্রযোজক ও পরিচালকরাও জানতেন, সুচিত্রা সেনের স্বাচ্ছন্দ্যের বিষয়টি নিশ্চিত করতে না পারলে শুটিংয়ের পরিবেশ সহজে স্বাভাবিক রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
সত্তরের দশকে পরিচালক অজয় করের ‘দত্তা’ ছবির শুটিং চলছিল মহিষাদল রাজবাড়িতে। ভোর থেকে টানা কাজের পর ব্রেকফাস্টের সময় হলে সুচিত্রা সেন নিজের মেকআপ রুমে চলে যান। অন্যদিকে শুটিং ফ্লোরে বসে সকালের খাবার খাচ্ছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও শমিত ভঞ্জ। তাঁদের প্লেটে পরিবেশন করা হয়েছিল পাউরুটি, সেদ্ধ ডিম ও কলা। প্রথমে সবকিছুই স্বাভাবিক মনে হলেও কিছুক্ষণ পর একটি অদ্ভুত বিষয় চোখে পড়ে। শমিত ভঞ্জের প্লেটে থাকা ডিমটির খোলসের গায়ে স্পষ্ট করে লেখা রয়েছে ‘সুচিত্রা সেন’।
আরও পড়ুন: “সমানে চু’মু খেয়েই যাচ্ছিল…” রোজ ব্রেকফাস্ট-ডিনারের জন্য চাপ, বিরোধিতা করতেই ক্যামেরার সামনে সীমা ছাড়ালেন সহ-অভিনেতা! শারী’রিক হেন’স্থার শি’কার জনপ্রিয় অভিনেত্রী! নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ভয়ংকর সব অভিজ্ঞতা ফাঁস, কার বিরুদ্ধে আনলেন অভিযোগ?
ডিমের গায়ে মহানায়িকার নাম দেখে প্রথমে হতবাক হয়ে যান শমিত ভঞ্জ। পাশে বসা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ও বিষয়টি বুঝে উঠতে পারছিলেন না। কেন একটি ডিমের গায়ে সুচিত্রা সেনের নাম লেখা থাকবে, তা নিয়ে দু’জনের মধ্যেই শুরু হয় কৌতূহল। ঠিক তখনই দূর থেকে প্রোডাকশন ম্যানেজারের চিৎকার শোনা যায় “শমিতবাবু, দয়া করে ওই ডিম খাবেন না!” আচমকা এই সতর্কবার্তায় পরিস্থিতি আরও রহস্যময় হয়ে ওঠে। শুটিং ইউনিটের অনেকেই তখন জানতে চান, ডিমটিকে ঘিরে এমন হইচইয়ের কারণ কী। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেখানে এসে উপস্থিত হন সুচিত্রা সেনও।
সকলের কৌতূহলের অবসান ঘটিয়ে প্রোডাকশন ম্যানেজার জানিয়ে দেন, ওই ডিমটি আসলে সুচিত্রা সেনের জন্য রাখা হয়েছিল। আসলে সুচিত্রা সেন সাধারণ পোলট্রির ডিম খেতেন না। তাঁর জন্য বিশেষভাবে দেশি মুরগির ডিম আনা হয়েছিল। কিন্তু ইউনিটের অন্য কারও সঙ্গে যাতে সেটি বদলে না যায় বা ভুলবশত অন্য কেউ খেয়ে না ফেলেন, সেই কারণেই ডিমের গায়ে পেন দিয়ে লিখে দেওয়া হয়েছিল ‘সুচিত্রা সেন’।
বিষয়টি জানার পর সৌমিত্র ও শমিত দু’জনেই অবাক হয়ে যান। তবে সবচেয়ে মজার প্রতিক্রিয়া দেন স্বয়ং সুচিত্রা সেন। গোটা ঘটনা শুনে তিনি হেসে বলেন, “শেষমেশ ডিমের গায়েও আমার নাম উঠল!” তাঁর সেই প্রাণখোলা হাসি মুহূর্তেই শুটিং ফ্লোরের পরিবেশ হালকা করে দিয়েছিল। বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এই ছোট্ট ঘটনাটি আজও মহানায়িকার ব্যক্তিত্ব, রসবোধ এবং তাঁর তারকাসুলভ জীবনযাপনের এক মজার স্মৃতি হয়ে রয়ে গেছে।






