বিনোদন জগতের তারকাদের পর্দার জীবনের আড়ালে লুকিয়ে থাকে এমন অনেক গল্প, যা সাধারণ দর্শকের অজানাই থেকে যায়। ক্যামেরার সামনে হাসিমুখে থাকা অভিনেতা-অভিনেত্রীদের ব্যক্তিগত জীবনেও থাকে লড়াই, সম্পর্কের টানাপোড়েন, পরিবার হারানোর কষ্ট এবং নতুন করে পরিবার খুঁজে পাওয়ার গল্প। দীর্ঘদিন ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করা তারকাদের জীবনের এমন অজানা অধ্যায় প্রকাশ্যে এলে স্বাভাবিকভাবেই তা নিয়ে তৈরি হয় আগ্রহ। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে নিজের দাম্পত্য, প্রেম, পরিবার এবং কর্মজীবনের নানা কথা বলতে গিয়ে তেমনই বেশ কিছু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিলেন অভিনেত্রী মৌসুমী ভট্টাচার্য। টেলিভিশন ও বাংলা সিনেমার পরিচিত মুখ মৌসুমী কথা বলেছেন তাঁর দীর্ঘ ১৫ বছরের দাম্পত্যজীবন নিয়ে।
সহ-অভিনেতা দীপাঞ্জন ভট্টাচার্য অর্থাৎ জ্যাকের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের শুরু হয়েছিল কাজের সূত্রেই। ২০১০ সালে একটি ধারাবাহিকের শুটিংয়ে তাঁদের প্রথম পরিচয়। সেই ধারাবাহিকে জ্যাক ছিলেন তাঁর অনস্ক্রিন স্বামী। প্রথম দিকে মৌসুমী ছিলেন যথেষ্ট সংযত, কারণ সেটি ছিল তাঁর অভিনয় জীবনের শুরুর দিক এবং জ্যাক ছিলেন তাঁর তুলনায় অনেক বেশি অভিজ্ঞ। কিন্তু একসঙ্গে কাজ করতে করতে ধীরে ধীরে তাঁদের মধ্যে বন্ধুত্ব ও ভালো লাগা তৈরি হয়। প্রায় ছয়-সাত মাসের মধ্যেই সেই সম্পর্ক বিয়ের সিদ্ধান্তে পৌঁছে যায়। মৌসুমীর কথায়, জ্যাক একদিন হঠাৎ করেই তাঁকে বলে বসেন, ‘চল বিয়ে করি।’ শেষ পর্যন্ত ২০১১ সালে ঘরোয়া আয়োজনে তাঁদের বিয়ে হয়। তবে সেই বিয়ের পিছনে ছিল মৌসুমীর জীবনের এক আবেগঘন অধ্যায়।
ছোটবেলাতেই তিনি মাকে হারান। এরপর পড়াশোনা ও অভিনয়ের কারণে হোস্টেলে থাকা, পরে টালিগঞ্জে আলাদা থাকা এভাবেই নিজের জীবন গড়ে তুলতে শুরু করেন তিনি। অভিনয়ে আসা নিয়েও বাবার সঙ্গে তাঁর মতবিরোধ ছিল। পরিবারে আগে কেউ ক্যামেরার সামনে কাজ করেননি, তাই অভিনয়কে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়া সহজ ছিল না। পরিস্থিতির কারণে বাবাকে বিয়ের কথা জানিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু তিনি বিয়েতে উপস্থিত থাকতে পারেননি। দিদিরাও তখন দূরে ছিলেন। ফলে বিয়ের সময় নিজের পরিবারের কাউকেই পাশে পাননি মৌসুমী। কিন্তু এখানেই তাঁর জীবনে জ্যাকের পরিবার হয়ে ওঠে বড় আশ্রয়। বিয়ের আগের দিন থেকেই তিনি জ্যাকের বাড়িতে ছিলেন।
জ্যাকের মা, বোন এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা তাঁকে নিজের মেয়ের মতোই গ্রহণ করেছিলেন। এমনকি বিয়ের সমস্ত আচার-অনুষ্ঠানেও তাঁকে একইভাবে সামিল করা হয়। তাই বাবার অনুপস্থিতি নিয়ে তাঁর মনে কোনও স্থায়ী আক্ষেপ তৈরি হয়নি বলেই জানান অভিনেত্রী। দাম্পত্যের ১৫ বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁদের সম্পর্কের মধ্যে বন্ধুত্ব ও খুনসুটি এখনও একইরকম রয়েছে। সাক্ষাৎকারে দুজনেই মজার ছলে নিজেদের সম্পর্কের নানা দিক তুলে ধরেছেন। মৌসুমীর কথায়, সংসারের বেশিরভাগ দায়িত্ব তিনিই সামলান। রান্না করা, বাজার করা থেকে শুরু করে বাড়ির নানা কাজ এবং পোষ্যদের দেখাশোনা সব মিলিয়ে তাঁর ব্যস্ততা কম নয়। অন্যদিকে, দুজনের জীবনযাপনেও নেই অতিরিক্ত আড়ম্বর।
কাজ কম থাকলেও অযথা খরচ না করে সামর্থ্য অনুযায়ী ঘুরতে যাওয়া, বাড়িতে রান্না করে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়া এই সাধারণ জীবনযাপনই তাঁদের পছন্দ। তাঁদের পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্য হল তাঁদের পোষ্যরা, যাদের নিয়েও দুজনের জীবনে যথেষ্ট ব্যস্ততা ও আনন্দ রয়েছে। তবে ব্যক্তিগত জীবনের পাশাপাশি সাক্ষাৎকারে বাংলা ইন্ডাস্ট্রির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়েও স্পষ্ট মত জানিয়েছেন মৌসুমী। তাঁর দাবি, বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিকে রাজনীতিমুক্ত পরিবেশ দেওয়া প্রয়োজন। তাঁর মতে, রাজনীতির সঙ্গে ইন্ডাস্ট্রির অতিরিক্ত যোগসূত্র শিল্পের স্বাভাবিক পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
আরও পড়ুনঃ নাটকের জন্য জেল খেটেও থামেনি অভিনয়ের জেদ, বাংলা বিনোদন জগতের প্রবাদপুরুষ উৎপল দত্তের হাত ধরেই বদলে গিয়েছিল মঞ্চ! আপসহীন আদর্শে ‘কল্লোল’-সহ একের পর এক নাটকে ছড়িয়েছিল প্রতিবাদের ভাষা! মৃ’ত্যুর ৩৩ বছর পরও, সমান সমাদৃত তাঁর সৃষ্টি! কিংবদন্তির মৃ’ত্যুবার্ষিকীতে প্রকাশ্যে এল তাঁর জীবনের কোন অজানা অধ্যায় ?
রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকা প্রত্যেকের অধিকার হলেও কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক আনুগত্য যেন প্রভাব না ফেলে, সেটাই তাঁর বক্তব্য। একইসঙ্গে তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে কাজ করার পরও গত ১৬ মাস ধরে তিনি কোনও মেগা সিরিয়ালে অভিনয় করেননি। তাঁর কথায়, ২৫ বছরের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে যে পারিশ্রমিক তিনি প্রত্যাশা করেন, বর্তমান বাজেট কাঠামোয় সেটিও অনেক সময় পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে কাজের সুযোগ থাকলেও পারিশ্রমিকের প্রশ্নে তৈরি হচ্ছে নতুন সমস্যা। ব্যক্তিগত জীবন থেকে ইন্ডাস্ট্রির অন্দরমহল এই সাক্ষাৎকারে মৌসুমীর অকপট কথায় উঠে এল তাঁর জীবনের বহু অজানা অধ্যায়।






