বর্তমান সময়ে বিনোদন জগতে অনেক অভিনেতা-অভিনেত্রীদের মুখেই শোনা যায় তাঁদের সংগ্রামের গল্প। কেউ বলেন স্টেশনে রাত কাটিয়েছেন, কেউ বলেন না খেয়ে দিন কেটেছে, আবার কেউ দাবি করেন দীর্ঘ লড়াইয়ের পর তাঁরা নিজেদের জায়গা তৈরি করেছেন। এই ধরনের গল্প শুনে অনেক সময় সাধারণ মানুষের মনেও আবেগ তৈরি হয়। তবে সেই সমস্ত অভিজ্ঞতার সত্যতা নিয়েও মাঝেমধ্যে প্রশ্ন ওঠে। কারণ, সব সংগ্রামের গল্প যে একই রকম নয়, সেটাও মনে করিয়ে দেন অনেকেই। আর এবার এই বিষয় নিয়েই খোলাখুলি মুখ খুললেন বর্ষীয়ান অভিনেত্রী তনিমা সেন।
বাংলা চলচ্চিত্র, টেলিভিশন এবং থিয়েটারের অত্যন্ত পরিচিত মুখ তনিমা সেন বহু বছর ধরে নিজের অভিনয় দক্ষতা দিয়ে দর্শকদের মন জয় করে আসছেন। বিশেষ করে তাঁর অসাধারণ কমিক টাইমিং এবং সংবেদনশীল চরিত্রে সাবলীল অভিনয় তাঁকে আলাদা পরিচিতি এনে দিয়েছে। অভিনয় জগতে তাঁর যাত্রা শুরু হয়েছিল মঞ্চ নাটকের মাধ্যমে। পাড়ার একটি নাটকে অভিনয় করেই প্রথম নজরে আসেন তিনি। পরে ১৯৮৪ সালে একটি স্থানীয় নাট্যদলের সঙ্গে যুক্ত হন এবং ১৯৮৫ সালে কলকাতার বিখ্যাত স্টার থিয়েটারে ‘বালুচরী’ নাটকে অভিনয় করে বড় সাফল্য পান। নাটকটি এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে প্রায় ৫০০টি শো মঞ্চস্থ হয়েছিল।
মঞ্চের পাশাপাশি বাংলা সিনেমাতেও নিজের জায়গা তৈরি করেন তনিমা সেন। ‘বর আসবে এখুনি’, ‘প্রেম বাই চান্স’, ‘গোগোলের কীর্তি’, ‘অভিশপ্ত নাইটি’, ‘কণ্ঠ’ কিংবা ‘কোরাপাক’-এর মতো ছবিতে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে দেখা গিয়েছে তাঁকে। সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া ‘শ্রীমান ভার্সেস শ্রীমতি’ ছবিতেও অভিনয় করেছেন তিনি। সিনেমার পাশাপাশি ছোট পর্দাতেও তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে। ‘দেবী চৌধুরাণী’, ‘ফিরকি’, ‘বিবি চৌধুরানী’, ‘রাম কৃষ্ণ’, ‘উড়ান’ এবং ‘তেঁতুলপাতা’র মতো ধারাবাহিকে মা, কাকিমা কিংবা ঠাকুমার চরিত্রে অভিনয় করে বাংলার ঘরে ঘরে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন তিনি। অভিনয়ের পাশাপাশি নাটক লেখাতেও তাঁর আগ্রহ রয়েছে। তাঁর লেখা ‘স্বর্গের কাছে’ নাটকটি প্রশংসাও কুড়িয়েছিল।
আরও পড়ুন: “আমি অনেকদিন আগেই দল থেকে সরে আসছিলাম… ফেল করবে আশা করেছিলাম, কারণ সরকার আদর্শচ্যুত হচ্ছিল!” তৃণমূলের ভরাডুবি নিয়ে বিস্ফো’রক প্রাক্তন বিধায়ক চিরঞ্জিত চক্রবর্তী!
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বর্তমান সময়ের শিল্পীদের সংগ্রামের গল্প নিয়ে নিজের মতামত প্রকাশ করেন অভিনেত্রী। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, এখন অনেকেই নিজেদের জীবনের কষ্টের কথা বলতে গিয়ে অতিরঞ্জিত গল্প বলেন। বিশেষ করে “স্টেশনে রাত কাটানোর” মতো অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তনিমা সেনের কথায়, “অনেকে বলেন স্টেশনে রাত কাটিয়েছি। কিন্তু যদি বাড়ি বাগবাজারে হয়, তাহলে কেন স্টেশনে রাত কাটাতে যাবে? সামান্য কষ্ট করে বাড়ি ফেরা তো সম্ভব।” তাঁর মতে, সংগ্রাম মানেই সব সময় নাটকীয় কিছু নয়। অনেকেই বাস্তবের তুলনায় গল্পকে বড় করে দেখান।
তবে এর অর্থ এই নয় যে তাঁর নিজের জীবনে কোনও কঠিন সময় আসেনি। বরং অভিনেত্রী স্বীকার করেছেন, তিনিও জীবনে বহু খারাপ সময়ের মুখোমুখি হয়েছেন। তিনি জানান, তাঁদের পরিবারের গাড়ির ব্যবসা ছিল। ছোটদের স্কুলে পৌঁছে দেওয়া এবং নিয়ে আসার কাজ করতেন তাঁরা। সেই সময় তিনি নিজেও জিপ গাড়ি চালিয়ে স্কুলের বাচ্চাদের আনা-নেওয়ার কাজ করেছেন। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতাকে তিনি কখনও “বড় সংগ্রাম” হিসেবে দেখাতে চাননি। তাঁর কথায়, জীবনের বাস্তব সমস্যাকে সম্মান করা উচিত, কিন্তু সেটাকে বাড়িয়ে বলা ঠিক নয়।
অভিনেত্রীর এই মন্তব্য ইতিমধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। অনেকেই তাঁর স্পষ্টভাষী মনোভাবকে সমর্থন করেছেন। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, প্রত্যেক মানুষের সংগ্রামের অভিজ্ঞতা আলাদা, তাই সেটিকে বিচার করা কঠিন। তবে একটা বিষয় পরিষ্কার, দীর্ঘ অভিনয় জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই তনিমা সেন এই কথা বলেছেন। আজ যখন অনেকেই নিজের সাফল্যের পিছনের গল্পকে আরও নাটকীয় করে তুলতে চান, তখন তনিমা সেন বাস্তব জীবনের সহজ এবং সৎ অভিজ্ঞতার কথাই সামনে আনতে চেয়েছেন।






