সিঁদুর কি শুধুই বিবাহিত নারীর পরিচয়, নাকি সময়ের সঙ্গে বদলে গিয়েছে তার অর্থ? সাম্প্রতিক সময়ে টলিউডের দুই পরিচিত অভিনেত্রী রূপা গঙ্গোপাধ্যায় ও পল্লবী চট্টোপাধ্যায় নিজেদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে গেলেও সিঁদুর পরার কথা প্রকাশ্যে জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, সিঁদুর পরা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয়। এই নিয়েই সমাজমাধ্যমে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা। এবার সেই বিতর্কে নিজের মতামত প্রকাশ করলেন লেখিকা তসলিমা নাসরিন। সমাজের বিভিন্ন স্তরের নারীদের জীবনে সিঁদুরের আলাদা আলাদা অর্থ কী ভাবে তৈরি হয়েছে, সেই বিষয়টিই তুলে ধরেছেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে বলিউড অভিনেত্রী রেখা থেকে শুরু করে সাধারণ নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের নারীদের কথা। সিঁদুরের মতো একটি প্রচলিত চিহ্নকে কেন্দ্র করে সমাজের শ্রেণিভেদ এবং মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন লেখিকা।
তসলিমা তাঁর লেখায় প্রথমেই তুলে ধরেছেন নামী ও উচ্চবিত্ত নারীদের প্রসঙ্গ। বলিউডের ভানুরেখা গণেশন, যিনি রেখা নামে পরিচিত, কিংবা টলিউডের রূপা গঙ্গোপাধ্যায় ও পল্লবী চট্টোপাধ্যায়ের মতো অভিনেত্রীরা স্বামী ছাড়াই সিঁদুর পরেন। তাঁদের কাছে এটি ব্যক্তিগত পছন্দ এবং সাজের একটি অংশ। তাঁরা নিজেদের ইচ্ছাতেই সিঁদুর পরেন বলে জানিয়েছেন। লেখিকার পর্যবেক্ষণ, সমাজের উচ্চবিত্ত বা পরিচিত মহিলাদের ক্ষেত্রে এই বিষয়টিকে সহজেই ব্যক্তিস্বাধীনতা কিংবা শখ হিসেবে মেনে নেওয়া হয়। কেউ কেউ কটাক্ষ করলেও নিজেদের আর্থিক ও সামাজিক অবস্থানের কারণে তাঁরা সেই মন্তব্যকে উপেক্ষা করে এগিয়ে যেতে পারেন। অর্থাৎ, তাঁদের সিঁদুর পরার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও সমাজের চাপ তাঁদের জীবনযাত্রাকে বিশেষভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। এই জায়গা থেকেই তসলিমা নামী নারীদের সিঁদুর পরার বিষয়টিকে আলাদা করে দেখেছেন।
এরপর লেখিকা নজর দিয়েছেন সমাজের সেই নারীদের দিকে, যাঁদের কথা সাধারণত আলোচনায় আসে না। নিম্নবিত্ত ও প্রান্তিক এলাকার অনেক নারী রয়েছেন, যাঁদের স্বামী হয় তাঁদের ছেড়ে চলে গিয়েছেন, নয়তো মারা গিয়েছেন। তা সত্ত্বেও তাঁদের অনেককে শাঁখা ও সিঁদুর পরতে দেখা যায়। তসলিমার লেখায় উঠে এসেছে, এই নারীদের কাছে সিঁদুর শুধুমাত্র সাজের বিষয় নয়। বরং প্রতিদিনের জীবনযাপনে নানা ধরনের সমস্যা এড়ানোর জন্য এটি তাঁদের কাছে এক ধরনের নিরাপত্তার উপায়। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, রাস্তাঘাটে অপরিচিত পুরুষদের অযাচিত ঝামেলা এড়াতে এবং সমাজের চোখে নিজের সম্মান বজায় রেখে কাজ করে খেতে শাঁখা-সিঁদুর সাহায্য করে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে একা নারীকে অনেক সময় নানা প্রশ্ন ও সমস্যার মুখে পড়তে হয়। সেই পরিস্থিতিতে বিবাহিত পরিচয়ের চিহ্ন তাঁদের কাছে এক ধরনের সুরক্ষা বর্ম হয়ে ওঠে। অর্থাৎ, স্বামী জীবনে না থাকলেও বেঁচে থাকার প্রয়োজনে তাঁরা এই চিহ্ন ব্যবহার করে চলেছেন।
তবে তসলিমার মতে, সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছেন মধ্যবিত্ত পরিবারের নারীরা। উচ্চবিত্তদের কাছে সিঁদুর পরা যেমন ব্যক্তিগত শখ, তেমনই প্রান্তিক নারীদের কাছে তা অনেক সময় নিরাপত্তার প্রয়োজন। কিন্তু মধ্যবিত্ত নারীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি এখনও সামাজিক নিয়ম ও সংস্কারের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। স্বামী থাকা সত্ত্বেও কোনও নারী সিঁদুর না পরলে তাঁকে অসংস্কারী কিংবা আধুনিকতার অহংকার রয়েছে বলে কটাক্ষ শুনতে হয়। আবার স্বামী না থাকা বা বিবাহবিচ্ছেদের পরেও কেউ সিঁদুর পরলে তাঁকে লোকদেখানো বলে মন্তব্য করেন অনেকে। আত্মীয়স্বজন থেকে শুরু করে প্রতিবেশী, সকলের কাছেই নিজের সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দিতে হয় তাঁদের। সিঁথিতে সিঁদুর আছে কি নেই, তা নিয়েই যেন একজন নারীর ব্যক্তিগত জীবন বিচার করার অধিকার নিয়ে নেয় সমাজ। লেখিকার মতে, সামাজিক নিয়ম মেনে চলার চাপ এবং সেই নিয়ম ভাঙলে কৈফিয়ত দেওয়ার দায় সবচেয়ে বেশি মধ্যবিত্ত নারীদেরই বহন করতে হয়।
আরও পড়ুনঃ “আমার ছোটবেলাটা খুব টাফ ছিল, বাবা চাইতেন না মেয়ে ডাক্তার হোক তাই ২১ বছরেই আমার বিয়ে দিয়ে দেন…” কেন মেয়ের স্বপ্নের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন বাবা? চিকিৎসক, অভিনেত্রী ও সমাজসেবী, এক জীবনে এত পরিচয়! স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ, দীপান্বিতা হাজারির পাঁচ দশকের পথচলা আজও অনুপ্রেরণা!
সব মিলিয়ে তসলিমা নাসরিনের বক্তব্য, সিঁদুরের প্রচলিত অর্থের পাশাপাশি সমাজে এর শ্রেণিভিত্তিক ব্যবহারও তৈরি হয়েছে। তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, নামী বা উচ্চবিত্ত নারীদের কাছে সিঁদুর অনেক সময় শখ ও ফ্যাশনের বিষয়, দরিদ্র নারীদের কাছে তা নিরাপত্তার প্রয়োজন, আর মধ্যবিত্ত নারীদের কাছে এখনও সামাজিক নিয়মের বাধ্যবাধকতা। অর্থাৎ, একই চিহ্ন হলেও প্রত্যেকের জীবনে তার অর্থ এক নয়। সিঁথিতে সিঁদুর দেখেই কোনও নারীর ব্যক্তিগত জীবন, দাম্পত্য সম্পর্ক কিংবা সংসারের বাস্তব পরিস্থিতি বুঝে নেওয়া সম্ভব নয়। কারণ, একজন নারী কেন সিঁদুর পরছেন, তার পিছনে থাকতে পারে সম্পূর্ণ আলাদা অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজন। সাম্প্রতিক তারকাদের সিঁদুর পরা নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্ককে সামনে রেখেই সমাজের এই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির কথা তুলে ধরেছেন লেখিকা। তাঁর এই পর্যবেক্ষণ ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে সিঁদুর, নারীর ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং সমাজের প্রত্যাশা নিয়ে।






