বাংলা সিনেমার মহানায়ক উত্তম কুমারকে ঘিরে আজও নানা অজানা ঘটনা সামনে আসে। তাঁর অভিনয়, ব্যক্তিত্ব এবং জনপ্রিয়তার গল্পের পাশাপাশি উঠে আসে নিজেকে আরও ভালো করার তাঁর চেষ্টার কথাও। তেমনই একটি ঘটনা ঘটেছিল উত্তম কুমারের কেরিয়ারের একেবারে অন্য সময়ে। তখন তিনি ধীরে ধীরে বাংলা সিনেমায় নিজের জায়গা শক্ত করে তুলছেন। ভবানীপুরের বাড়ি থেকে বাসে করে নিয়মিত সিঁথির মোড়ের এমপি স্টুডিয়োতে যাতায়াত করতেন তিনি। সেই বাসেই প্রায়ই দেখা হতো সাহিত্যিক ও সাংবাদিক নিমাই ভট্টাচার্যের সঙ্গে। একই পথে নিয়মিত যাতায়াত করতে করতেই দুজনের মধ্যে গড়ে উঠেছিল গভীর বন্ধুত্ব।
পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি বদলে যায়, উত্তম কুমার হয়ে ওঠেন বাংলা ছবির অন্যতম বড় তারকা। অন্যদিকে নিমাই ভট্টাচার্যও দেশের প্রথম সারির সংবাদপত্রে পরিচিত সাংবাদিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। এই সময় দিল্লির বিজ্ঞান ভবনে ঘটে যায় এমন একটি ঘটনা, যার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন নিমাই ভট্টাচার্য। সেবার ঐতিহ্যবাহী ‘ভরত’ পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছিলেন উত্তম কুমার। দিল্লিতে পুরস্কার নেওয়ার পর তাঁর সাক্ষাৎকার নিতে এসেছিলেন আকাশবাণীর এক প্রতিনিধি। সাক্ষাৎকারটি সারা দেশে সম্প্রচারিত হওয়ার কথা ছিল এবং নিমাই ভট্টাচার্যও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। প্রশ্নোত্তর শুরু হতেই তিনি লক্ষ্য করেন, উত্তম কুমার ইংরেজিতে উত্তর দিচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু কথার মধ্যে বেশ কিছু ব্যাকরণগত ভুল থেকে যাচ্ছে।
বন্ধু এবং সেই সময়ের জাতীয় তারকার সম্মান যাতে কোনওভাবেই নষ্ট না হয়, সেই পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেন নিমাই ভট্টাচার্য। তিনি সাক্ষাৎকারটি মাঝপথে থামিয়ে সাংবাদিককে জানান, উত্তমকুমারকে জরুরি কাজে এখনই বেরোতে হবে। তাঁর পরামর্শ ছিল, প্রশ্নগুলি রেখে গেলে দুদিন পরে এসে আবার সাক্ষাৎকার রেকর্ড করা যাবে। উত্তম কুমারও বন্ধুর ইঙ্গিত বুঝে সেই পরিকল্পনাতেই রাজি হয়ে যান। সাংবাদিক চলে যাওয়ার পর নিমাই ভট্টাচার্য সরাসরি মহানায়ককে তাঁর ইংরেজির ভুলের কথা জানান। তিনি বোঝান, উত্তমকুমার তখন শুধু বাংলার নয়, গোটা দেশের পরিচিত তারকা, তাই সারা দেশের মানুষ তাঁর কথা শুনবে। সেই ভুলের কথা শুনে উত্তম কুমার কোনও রাগ বা অহংকার দেখাননি, বরং বন্ধুর পরামর্শকে গুরুত্ব দিয়ে সেদিনই উত্তরগুলি নতুন করে তৈরি করতে বসেন।
আরও পড়ুন: “তোমরা কেমন বেড পার্টনার?” ‘চাঙ্গি মুঙ্গি’ বলে কটা’ক্ষ করেছিলেন, তারপরই বদলে গেল সব! সায়কের সঙ্গে একই খাটে রাজবীর, তাও আবার একই কম্বলের নিচে! নন্দিনীর এক প্রশ্নে ফাঁস হল আসল রহস্য, বিগ বসের ঘরে হঠাৎ এমন ঘনি*ষ্ঠতা কেন?
ইংরেজিতে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর কীভাবে ঠিকভাবে দেওয়া যায়, তা নিয়ে নিমাই ভট্টাচার্যের সঙ্গে বসে প্রস্তুতি নেন উত্তম কুমার। দুদিন পর সেই প্রস্তুত করা উত্তর দিয়েই ফের সাক্ষাৎকারটি রেকর্ড করা হয়। তবে ঘটনাটি সেখানেই শেষ হয়নি, বরং কয়েক মাস পরে আরও একটি ঘটনা উত্তম কুমারের মানসিকতার অন্য দিক প্রকাশ করে। একদিন নিজের বাড়িতে নিমাই ভট্টাচার্যকে নিমন্ত্রণ করেছিলেন মহানায়ক। আড্ডার মাঝেই তিনি বন্ধুকে জানান, এবার শেক্সপিয়রের কবিতা আবৃত্তি করে শোনাবেন এবং এরপর থেকে দুজন শুধুই ইংরেজিতে কথা বলবেন। এরপর নিমাই ভট্টাচার্য যে উত্তম কুমারকে দেখেছিলেন, তিনি আগের সেই দিনের মানুষটি ছিলেন না। কোনও তোতলামি বা ভুল ছাড়াই সাবলীলভাবে এবং স্পষ্ট উচ্চারণে ইংরেজিতে কথা বলছিলেন উত্তম কুমার, যা দেখে বন্ধুও বিস্মিত হয়ে যান।
নিমাই ভট্টাচার্যের চোখের সামনে ধরা পড়েছিল, নিজের দুর্বলতা বুঝতে পেরে কতটা পরিশ্রম করে তা কাটিয়ে উঠতে পারেন একজন মানুষ। দিল্লির বিজ্ঞান ভবনে যে ইংরেজি নিয়ে ভুল করেছিলেন, কয়েক মাসের মধ্যেই সেই জায়গায় নিজেকে অনেকটাই বদলে ফেলেছিলেন উত্তম কুমার। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল, এত বড় তারকা হয়েও নিজের ভুল মেনে নিতে তাঁর কোনও আপত্তি ছিল না। বরং সেই ভুলকে ঠিক করার জন্য বন্ধুর পরামর্শ গ্রহণ করে নিয়মিত অনুশীলনের পথ বেছে নিয়েছিলেন তিনি। নিমাই ভট্টাচার্য এই ঘটনা থেকে বুঝেছিলেন, নিজের উন্নতির পথে উত্তম কুমারের ইচ্ছাশক্তি কতটা প্রবল ছিল। জনপ্রিয়তা বা তারকা হওয়ার অহংকার তাঁকে নিজের দুর্বলতা স্বীকার করা থেকে আটকাতে পারেনি। হয়তো নিজের ভুলকে মেনে নিয়ে তা সংশোধন করার এই জেদ এবং নিজেকে প্রতিদিন আরও ভালো করে তোলার মানসিকতাই তাঁকে মানুষের মনে চিরকালের মহানায়ক করে রেখেছে।






