উত্তমকুমারের ঠোঁটে যে কণ্ঠ একসময় ছিল অবিচ্ছেদ্য, সেই হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গানই তাঁর ছবিতে হঠাৎ কেন বন্ধ হয়েছিল? যাঁদের যুগলবন্দি বাংলা চলচ্চিত্রকে দিয়েছিল অসংখ্য কালজয়ী গান, কোন অপ্রত্যাশিত ঘটনার জেরে চিড় ধরেছিল এই দুই কিংবদন্তির সম্পর্কে?

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে পর্দার সামনে যতটা আলো, সাফল্য আর করতালির ঝলকানি দেখা যায়, পর্দার আড়ালে ততটাই থাকে সম্পর্কের টানাপোড়েন, অভিমান এবং না বলা গল্প। বহু সময় দর্শকদের প্রিয় তারকাদের বন্ধুত্বও নানা কারণে পরীক্ষার মুখে পড়ে। তেমনই এক ঘটনা জড়িয়ে রয়েছে বাংলা সিনেমার দুই কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব মহানায়ক উত্তম কুমার এবং কিংবদন্তি গায়ক-সুরকার হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে। যাঁদের যুগলবন্দি বাংলা গানের ইতিহাসে এক স্বর্ণযুগ সৃষ্টি করেছিল, তাঁদের সম্পর্কেও একসময় চিড় ধরেছিল বলে জানা যায়।

উত্তম কুমার ও হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সম্পর্ক শুধু শিল্পী ও প্লেব্যাক গায়কের ছিল না, ছিল গভীর বন্ধুত্বেরও। ১৯৫০-এর দশক থেকে বাংলা চলচ্চিত্রে উত্তম কুমারের ঠোঁটে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠ যেন এক অবিচ্ছেদ্য সমীকরণ হয়ে উঠেছিল। ‘হারানো সুর’, ‘সপ্তপদী’, ‘শাপমোচন’, ‘সাগরিকা’ থেকে শুরু করে একের পর এক ছবিতে এই জুটি দর্শকদের উপহার দিয়েছে অসংখ্য কালজয়ী গান। এমনও একটা সময় ছিল, যখন দর্শকদের কাছে মনে হতো উত্তম কুমারের নিজের কণ্ঠস্বরই যেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গলা।

কিন্তু এই সাফল্যের মধ্যেই তৈরি হয়েছিল এক অপ্রত্যাশিত দূরত্ব। জানা যায়, ১৯৬০-এর দশকের শুরুতে হিন্দি চলচ্চিত্রে উত্তম কুমারকে প্রতিষ্ঠিত করার একটি বড় পরিকল্পনা করেছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। সে সময় বলিউডে সঙ্গীত পরিচালক এবং প্রযোজক হিসেবে হেমন্তর যথেষ্ট দাপট ছিল। ‘বিশ সাল বাদ’ ছবির সাফল্যের পর তিনি ‘শর্মিলি’ নামে একটি হিন্দি ছবি প্রযোজনা করার পরিকল্পনা করেন। ছবিটির পরিচালক ছিলেন বীরেন নাগ। এই ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্রে উত্তম কুমারকে নেওয়ার কথা ছিল এবং অনেকের মতে, এটি মহানায়কের বলিউড কেরিয়ারের অন্যতম বড় সুযোগ হতে পারত।

তবে শেষ মুহূর্তে ছবিটি নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। সূত্র অনুযায়ী, আসানসোলের কয়লাখনিতে শুটিং করার বিষয়টি নিয়ে আপত্তি জানিয়ে উত্তম কুমার ছবিতে অভিনয় করতে রাজি হননি। মহানায়কের এই সিদ্ধান্তে অত্যন্ত আঘাত পেয়েছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। কারণ, ছবিটির প্রস্তুতির জন্য ইতিমধ্যেই অনেকটা অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছিল। প্রকল্পটি বাতিল হয়ে যাওয়ায় তাঁকে উল্লেখযোগ্য আর্থিক ক্ষতির মুখেও পড়তে হয়।

এই ঘটনার পরই দুই কিংবদন্তির সম্পর্কে মনোমালিন্যের সূচনা হয়েছিল বলে চলচ্চিত্র মহলের একাংশ মনে করেন। শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্কেই নয়, এর প্রভাব নাকি তাঁদের পেশাগত কাজেও পড়েছিল। একসময় উত্তম কুমারের ছবিতে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠের ব্যবহার কমে আসে। পরিবর্তে অন্য গায়কদের কণ্ঠে মহানায়কের জন্য গান রেকর্ড হতে শুরু করে। ফলে বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় জুটি কিছুটা সময়ের জন্য আলাদা পথে হাঁটতে বাধ্য হয়েছিল।

আরও পড়ুনঃ চুক্তির বিয়ে থেকে তৃতীয় ব্যক্তির উপস্থিতি বিতর্কের মাঝেই, এবার জামাইষষ্ঠীও পালন করছেন না নীল-তৃণা! টলিপাড়ায় তুঙ্গে জল্পনা, তারকা দম্পতির সম্পর্ক কি সত্যিই এবার শেষের পথে? মুখ খুললেন তৃণা, কী জানালেন?

তবে এই দূরত্ব স্থায়ী হয়নি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সম্পর্কের বরফ গলেছিল বলেই জানা যায়। শিল্পের প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব শেষ পর্যন্ত সমস্ত অভিমানকে ছাপিয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীকালে আবারও তাঁদের সহযোগিতার নজির দেখা যায়, যদিও প্রথম যুগের সেই অবিশ্বাস্য রসায়নকে অনেকেই আজও অনন্য বলে মনে করেন। শুধু উত্তম কুমারই নন, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠ সেই সময় দেব আনন্দ, গুরু দত্ত, ধর্মেন্দ্র-সহ একাধিক তারকার পর্দার ব্যক্তিত্বকে অন্য মাত্রা দিয়েছিল। কিন্তু বাংলার দর্শকদের কাছে উত্তম-হেমন্ত যুগলবন্দির আবেদন ছিল আলাদা। তাই তাঁদের সম্পর্কের এই অজানা অধ্যায় আজও বাংলা সিনেমার ইতিহাসে সমানভাবে কৌতূহল ও আলোচনার বিষয় হয়ে রয়েছে।

You cannot copy content of this page