অভিনয়, নাটক থেকে থিয়েটার আর প্রতিবাদের ভাষা এই তিনটি শব্দ যেন আজও এক সুতোয় বাঁধা বিপ্লব বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবনে। সময় বদলেছে, বদলেছে রাজনৈতিক পরিবেশ, সংস্কৃতির চারপাশে তৈরি হয়েছে নানা চাপ ও শঙ্কা। তবু শিল্পীর জায়গা থেকে তিনি বারবার বুঝিয়ে দিয়েছেন, প্রতিবাদ কোনও আলাদা বিলাসিতা নয়, বরং দায়িত্ব। সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে তাঁর জীবনের সেই লড়াইয়ের গল্প—যেখানে থিয়েটার শুধুই মঞ্চের আলো নয়, সমাজের অন্ধকারের দিকেও আলো ফেলার এক মাধ্যম।
সেই সাক্ষাৎকারে বিপ্লব বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, “যেকোনও একটা পথ বেছে নিতে হয়, আমি প্রতিবাদের পথই বেছে নিয়েছি।” কিন্তু এই পথ যে সহজ নয়, সেটাও আড়াল করেননি। একটি নাটকের কারণে কেন্দ্রীয় সরকারের গ্রান্ট চিরতরে বন্ধ হয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে উঠে আসে কঠিন বাস্তব। সরকারি হল না পাওয়া, স্যালারি গ্রান্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর দিন দিন আনি খাই পরিস্থিতিতে পৌঁছনোর কথাও জানান তিনি। তাঁর মতে, একদিকে লড়াই আর অন্যদিকে সাবসিডির ওপর নির্ভরতা—এই দুই বিপরীত অবস্থান থেকে কোনও স্পষ্ট বার্তা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
এরপরেই সাক্ষাৎকারের কথোপকথনে উঠে আসে থিয়েটারের মাধ্যমে সমাজকে এক করার ভাবনা। ধর্মভিত্তিক রাজনীতিতে তৈরি হওয়া বিভাজনকে তিনি অস্বাস্থ্যকর বলেই মনে করেন। গ্রামবাংলায় নাটক পরিবেশন করতে গিয়ে সমাজের নানা স্তরের গল্প তুলে ধরতে চেয়েছেন, আর সেখানেই শাসকের রোষে পড়েছেন বারবার। ব্যানের মুখে পড়া তাঁর কাছে নতুন নয়। এই প্রসঙ্গে অনির্বাণ ভট্টাচার্যের কথাও উঠে আসে তাঁর মুখে। বিপ্লবের মতে, ব্যান শিল্পের সবচেয়ে বড় শত্রু, যা ইন্ডাস্ট্রির ক্ষতি ছাড়া কিছুই করে না। যত দ্রুত এই সংস্কৃতি শেষ হবে, ততই মঙ্গল বাংলা শিল্পজগতের।
ভয়ের কথাও অকপটে স্বীকার করেছেন তিনি। “ভয় একটা পবিত্র আবেগ”—এই কথার মাধ্যমে যেন অনেক কিছু বলে দিয়েছেন বিপ্লব বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর মতে, ভয়ই একমাত্র নিরবিচ্ছিন্ন অনুভূতি, বাকিটা বদলাতে পারে। বিশেষ করে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তাঁকে ভাবায়। তবে সেই ভয় থিয়েটারের সঙ্গে আপোষ করতে শেখায়নি। বরং তিনি সোজাসাপটা বলেছেন, অন্যায় বা লোভ না করলে আপোষের প্রশ্নই ওঠে না। ব্যান হলে হবে, তখন দেখা যাবে—এই মানসিকতাই তাঁর পথচলার একমাত্র অঙ্গীকার।
আরও পড়ুনঃ মাস পড়লেই বিয়ে, হাতে গোনা কদিন! এর মাঝেই হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ রণজয় বিষ্ণু! কি হয়েছে অভিনেতার? চিন্তায় অনুরাগীরা!
আরজিকর ঘটনার পর তৃণমূলের কিছু নেতা ও তাদের ঘনিষ্ঠ অভিনেতাদের বক্তব্যের প্রতিবাদে শ্রেষ্ঠ নির্দেশকের পুরস্কার ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তও সেই অবস্থানেরই অংশ। সাক্ষাৎকারে উঠে আসে তাঁর থিয়েটার শুরুর দিনগুলোর গল্প—চাকরি আর নাটক পাশাপাশি চলেছে দীর্ঘদিন। বামপন্থী আদর্শে অনুপ্রাণিত হলেও সেই সময়ের ব্রাত্য বসুর সঙ্গে আড্ডা, আলোচনা আজও স্মৃতিতে উজ্জ্বল অভিনেতার। ছোট ছোট চরিত্র করতে করতে একসময় বুঝেছিলেন, অভিনয়ই হয়তো তাঁর পেশা। তখনই ডালহৌসির চাকরি ছেড়ে পুরোপুরি অভিনয়ের পথ বেছে নেন তিনি। আজও সেই সিদ্ধান্তেই অনড় বিপ্লব বন্দ্যোপাধ্যায়—শাসকের নয়, সবসময় শোষিতের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকারে।






