যাঁর গানে কেঁদেছে বাংলা, মৃ’ত্যুর আগে সেই নির্মলা মিশ্রেকেও কাঁদতে হয়েছিল একা! লক্ষ মানুষের চোখ ভিজিয়েছিলেন, শেষ জীবনে তাঁর চোখ মুছিয়ে দেওয়ার কেউ ছিল না! চিকিৎসার খরচ জোগাতে হিমশিম, উপেক্ষিত শিল্পীর লড়াই ও অপূর্ণ জীবনের গল্পটা জানেন?

বাংলা গানের স্বর্ণযুগ বলতে আমরা যাঁদের নাম একবারই স্মরণ করি ঠিক তেমনি একজন নির্মলা মিশ্র। যাঁর গান লক্ষ লক্ষ মানুষকে কাঁদিয়েছে, অথচ শেষ জীবনে তাঁর চোখের জল মুছিয়ে দেওয়ার মানুষ ছিল হাতে গোনা। সময়ের নিষ্ঠুরতায় হারিয়ে যাওয়া এই শিল্পীর জীবনগাথা আজও অনেকের অজানা।

স্বর্ণযুগের সেই সময়টায় বাংলা ইন্ডাস্ট্রিতে নতুন মুখের জায়গা করে নেওয়া ছিল প্রায় অসম্ভব। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলের মতো কিংবদন্তিদের দাপটে অন্য গায়িকাদের জন্য সুযোগ সীমিত ছিল সেটা বলাই বাহুল্য। নির্মলা মিশ্রের গলায় না ছিল লতার মতো মধুর সুখ, না ছিল সন্ধ্যার মতো গভীর টান। কিন্তু ছিল এক অদ্ভুত একটা জিনিস—যা সরাসরি মানুষের মনে আঘাত করত। তবুও প্রথম সারির নায়িকাদের লিপে গান গাওয়ার সুযোগ তিনি খুব কমই পেয়েছেন। সুচিত্রা সেনের জন্য তাঁর কণ্ঠ ব্যবহার হয়েছে হাতে গোনা কয়েকবার।

ভাগ্যের মোড় ঘুরে যায় একেবারে অন্য জায়গায়। উড়িষ্যার একটি গান গেয়ে সেখানে তিনি বিপুল জনপ্রিয়তা পান। সেই রাজ্য তাঁকে দেয় সম্মান, ভালোবাসা বলা যেতে পারে প্রায় রানীর মতো স্বীকৃতি। কিন্তু বাংলায় সেই সম্মান আর ভালোবাসা তিনি কখনও সেভাবে পাননি। সত্তরের দশকে যখন বাংলা গানে নতুন হাওয়া বইছে, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও মান্না দে-র পাশে উঠে আসে নির্মলা মিশ্রের নাম। ‘ও তোতা পাখি’ গানটি তাঁকে এনে দেয় বিপুল জনপ্রিয়তা। তবুও এই সাফল্যের আড়ালেই চাপা পড়ে যায় তাঁর গাওয়া বহু কঠিন, ক্লাসিক্যাল ও মানসম্মত গান।

নিজের জীবনেও ছিল গভীর আক্ষেপ। তিনি বারবার বলতেন, মানুষ তাঁকে মনে রাখে মাত্র দু’টি গান দিয়ে—‘ও তোতা পাখি’ আর ‘এমন একটা ঝিনুক খুঁজে পেলাম না’। অথচ দ্বিতীয় গানটি গাওয়ার কথা ছিল না তাঁর। তিনি দ্রুতগতির গান পছন্দ করতেন, আর এই গানটি এমন ছিল না । কিন্তু সঙ্গীত পরিচালকের জোরাজুরিতে তিনি রাজি হন। সেই সিদ্ধান্তই তাঁকে অমর করে রাখে। আজও এই গান শুনলেই মানুষ নির্মলা মিশ্রকে মনে করে।

আরও পড়ুনঃ ‘আমরা ফাঁপা হয়ে যাচ্ছি…গ্লোরিফায়েড বৃদ্ধাশ্রমে পরিণত হচ্ছে’ চাপা পড়ে যাচ্ছে সাধারন মানুষের আওয়াজ! ভোটের হাওয়ায় উদ্বিগ্ন রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়! হঠাৎ কেন এমন বললেন?

কিন্তু জীবনের শেষ অধ্যায় ছিল বড়ই করুণ। নতুন গান রেকর্ডিংয়ের ডাক বন্ধ হয়ে যায়, তাছাড়াও স্টেজ শো-র কাজও কমে আসে। আর্থিক সমস্যায় ভেঙে পড়তে হয় তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে। চিকিৎসার খরচ জোগাতেও হিমশিম খেতে হয়েছে বলে জানা যায়। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের শ্রেষ্ঠ গায়িকার সম্মান এসেছিল ঠিকই, কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। মৃত্যুর সময় তাঁর চোখের জলই প্রমাণ করেছিল—এই শিল্পী জীবদ্দশায় কতটা উপেক্ষিত ছিলেন। বাংলা গান আজও তাঁর কাছে ঋণী, অথচ সেই ঋণের স্বীকৃতি তিনি পেলেন খুব দেরিতে।

You cannot copy content of this page