অভিনয় জগৎ যতটা আলোঝলমলে মনে হয়, তার আড়ালে লুকিয়ে থাকে অসংখ্য ত্যাগ, মানসিক চাপ আর নীরব যন্ত্রণা। মঞ্চ হোক বা পর্দা—দর্শকদের হাসি, কান্না কিংবা করতালির আড়ালে শিল্পীদের ব্যক্তিগত লড়াই খুব কম সময়ই সামনে আসে। অথচ একজন প্রকৃত শিল্পী দর্শকদের আনন্দ দিতে গিয়ে নিজের স্বস্তি, আরাম এমনকি শারীরিক কষ্টকেও অনেক সময় উপেক্ষা করেন। অভিনয় শুধু পেশা নয়, অনেকের কাছে তা এক ধরনের দায়বদ্ধতা—দর্শকের প্রতি, শিল্পের প্রতি।
ঠিক এমনই এক দায়বদ্ধ শিল্পীর নাম পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। দীর্ঘদিন সরকারি চাকরি করার পর তুলনামূলক দেরিতেই অভিনয় জগতে পা রাখেন তিনি। তবে বয়স বা দেরি কোনওটাই তাঁর অভিনয়যাত্রায় বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। সত্যজিৎ রায়ের পুত্র সন্দীপ রায়ের হাত ধরে পর্দায় আত্মপ্রকাশের পর থেকেই নিজের অভিনয় দক্ষতায় আলাদা জায়গা করে নেন পরাণ। আইপিটিএ-র সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতাও তাঁর অভিনয়ে এক আলাদা গভীরতা এনে দেয়।
নব্বইয়ের দশকে দূরদর্শনে ‘সাধনবাবুর সন্দেহ’ ছবির মাধ্যমে নজরে আসার পর একে একে কাজ করেছেন সন্দীপ রায়ের প্রায় সব ‘ফেলুদা’ ছবিতে। পাশাপাশি ‘দেখা’, ‘দ্য জ্যাপানিজ ওয়াইফ’, ‘সিনেমাওয়ালা’, ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’, ‘বব বিশ্বাস’, ‘বরুণবাবুর বন্ধু’, ‘টনিক’-সহ অসংখ্য ছবিতে তাঁর অভিনয় দর্শকদের মন ছুঁয়েছে। কখনও কমেডি, কখনও গম্ভীর চরিত্র—প্রতিটি ভূমিকায় স্বাভাবিক অভিনয়ের ছাপ রেখে গিয়েছেন তিনি।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে অভিনয়ের নেপথ্যের বাস্তবতা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি জানান, মঞ্চে অভিনয় করতে গিয়ে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন যেখানে শারীরিকভাবে আহত হলেও অভিনয় থামাননি। তাঁর কথায়, অভিনয়ের সময় যদি অভিনেতা রক্তাক্ত হন, তবুও সেই রক্তের ছাপ যেন অভিনয়ে না পড়ে—সেটাই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
আরও পড়ুনঃ যাঁর গানে কেঁদেছে বাংলা, মৃ’ত্যুর আগে সেই নির্মলা মিশ্রেকেও কাঁদতে হয়েছিল একা! লক্ষ মানুষের চোখ ভিজিয়েছিলেন, শেষ জীবনে তাঁর চোখ মুছিয়ে দেওয়ার কেউ ছিল না! চিকিৎসার খরচ জোগাতে হিমশিম, উপেক্ষিত শিল্পীর লড়াই ও অপূর্ণ জীবনের গল্পটা জানেন?
পরাণের মতে, একজন ভালো অভিনেতার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত দর্শকদের আনন্দ দেওয়া। অভিনেতার ব্যক্তিগত কষ্ট যদি অভিনয়ের উপর প্রভাব ফেলে, তাহলে দর্শকের দেখার আগ্রহ নষ্ট হয়। সেই কারণেই মঞ্চে বা ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের যন্ত্রণা আড়াল করে চরিত্রকে জীবন্ত করে তোলাই প্রকৃত অভিনয়।এই বর্ষীয়ান অভিনেতার কথায় যেন ধরা পড়ে শিল্পীর নিঃশব্দ আত্মত্যাগের গল্প।






