“এতদিন যা কষ্ট সহ্য করেছ, আরও কিছু ধৈর্য ধরো, আমি…” শহর বদলালেই জীবন বদলে যায় না! মুম্বই থেকে স্ত্রী গৌরী দেবীর উদ্দেশে মহানায়কের আকুতি ভরা চিঠি আজও ছুঁয়ে যায় হৃদয়! কী লেখা ছিল তাতে?

বাংলা সিনেমার ইতিহাসে মহানায়কের জীবন যেন দুই ভুবনের গল্প। একদিকে ভবানীপুরের ঘরোয়া সংসার, অন্যদিকে আলো ঝলমলে চলচ্চিত্র জগতের ব্যস্ততা। প্রতি রবিবার তিনি ছুটে যেতেন নিজের বাড়িতে, মা ও স্ত্রীর সঙ্গে কয়েকটি শান্ত মুহূর্ত কাটানোর আশায়। বাইরে থেকে সাফল্যের ঝলকানি যতই উজ্জ্বল হোক, ব্যক্তিগত জীবনে ছিল এক অদৃশ্য টানাপোড়েন। এই দ্বন্দ্বের মধ্যেই ধীরে ধীরে দূরত্ব তৈরি হচ্ছিল স্বামী স্ত্রীর মধ্যে, যা কেবল ভৌগোলিক নয়, মানসিক বলেও অনেকে মনে করেন। তবু সম্পর্কের সুতো ছিঁড়ে যায়নি, বরং চিঠির পাতায় পাতায় জেগে ছিল গভীর ভালোবাসা ও আকুলতা।

মুম্বইয়ে নিজের ভাগ্য গড়ার লড়াইয়ে ব্যস্ত সেই সময়ের মহানায়ক বুঝতে পারছিলেন শহর বদলালেই জীবন বদলে যায় না। কলকাতার পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে নতুন শহরে দাঁড়ানো মানেই অনিশ্চয়তার সঙ্গে প্রতিদিন যুদ্ধ। স্ত্রী তখন স্বামীর কাছে থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন, কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি ছিল কঠিন। কাজের অনিশ্চয়তা, অর্থাভাব আর ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা তাকে চেপে ধরেছিল। এই চাপের মধ্যেই তিনি প্রিয় মানুষটিকে একটি দীর্ঘ চিঠি লেখেন, যেখানে ফুটে ওঠে তার অসহায়তা, স্বপ্ন আর ভালোবাসার মিশ্র অনুভূতি।

চিঠির ভাষা ছিল সহজ অথচ হৃদয়স্পর্শী। তিনি লিখেছিলেন, ভেবেছিলেন ছোট্ট একটি ফ্ল্যাট নেবেন, যেখানে দুজনে একসঙ্গে থাকতে পারবেন। কিন্তু হাতে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিতে পারছিল না। মুম্বই শহরের খরচ ছিল আকাশছোঁয়া, প্রতিদিনের ব্যয় সামলাতেই তিনি হিমশিম খাচ্ছিলেন। সেই সময় একটি সাধারণ ফ্ল্যাটের ভাড়াও ছিল তার নাগালের বাইরে। বাজারের দেনা আর কাজের অনিশ্চয়তা মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে নতুন সংসারের স্বপ্ন যেন দূরের কুয়াশায় মিলিয়ে যেতে থাকে।

তবু চিঠির শেষ অংশে ছিল এক গভীর আশ্বাস আর মমতা। তিনি জানতেন, তার অনুপস্থিতিতে নানা গুজব ছড়াচ্ছে চারদিকে। তাই স্ত্রীকে অনুরোধ করেছিলেন কোনো কথায় কান না দিতে এবং নিজের শরীর ও মন ভালো রাখতে। তিনি লিখেছিলেন, এতদিন যে কষ্ট সহ্য করেছ, আর কিছুদিন ধৈর্য ধরো। এই কয়েকটি লাইনেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে এক শিল্পীর অন্তরের কোমল মানুষটি, যে খ্যাতির আড়ালে থেকেও সংসারের টান ভুলতে পারেননি কখনও।

আরও পড়ুনঃ “বারবার গ’র্ভপাত আমাকে ভেঙে দিয়েছিল…সীমাবদ্ধতাই আমাদের কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছিল!” ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তায় নিতে হয়েছিল কোন কঠিন সিদ্ধান্ত? সন্তান হারানোর বেদনা পেরিয়ে ২৪ বছরের দাম্পত্যে, সম্রাট ও ময়না জানালেন লড়াইয়ের গল্প!

শেষ পর্যন্ত মুম্বইয়ে নতুন করে ঘর বাঁধার স্বপ্ন পূরণ হয়নি। তাকে ফিরে আসতেই হয়েছিল নিজের শহরে, নিজের পরিচিত জীবনে। কিন্তু সেই অপূর্ণ ইচ্ছে, সেই দোটানা আর দুই সম্পর্কের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির গল্প ইতিহাসে অমলিন হয়ে রয়ে গেছে। হলুদ হয়ে যাওয়া চিঠির পাতায় আজও লুকিয়ে আছে এক যুগের আবেগ, সংগ্রাম আর ভালোবাসার নিঃশব্দ দলিল, যা পাঠকের মনে আজও একইরকম আলোড়ন তোলে।

You cannot copy content of this page