বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের মধ্যে দোলযাত্রা এক অনন্য আবেগের নাম। আর সেই আবেগে যদি জড়িয়ে থাকে মহানায়ক উত্তম কুমার, তবে উৎসব যেন অন্য মাত্রা পায়। রুপোলি পর্দায় রোমান্টিক নায়ক হিসেবে তিনি যেমন দর্শকের হৃদয় জয় করেছিলেন, তেমনই ব্যক্তিগত জীবনেও ছিলেন প্রাণখোলা উৎসবপ্রেমী মানুষ। পুরনো বিনোদন পত্রিকার পাতায় পাওয়া যায়, দোল মানেই ছিল ময়রা স্ট্রিটের বাড়িতে বন্ধুবান্ধব, সহকর্মী আর পাড়াপড়শিদের নিয়ে রঙের উচ্ছ্বাস। দরজা থাকত সবার জন্য খোলা। সাদা পাঞ্জাবি পরে বারান্দায় এসে দাঁড়ানো মাত্রই ভিড় জমত অনুরাগীদের। আবিরের ছোঁয়ায় সেই হাসি যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠত, আর বসন্ত পেত এক জীবন্ত প্রতিমা।
উত্তম কুমারের কাছে দোল কেবল রং খেলা ছিল না, ছিল এক মিলনমেলা। তিনি নিজে হাতে অতিথিদের জন্য শরবত বানাতেন, হাসিমুখে সবার সঙ্গে গল্পে মাততেন। স্টারডমের আড়াল ভেঙে সেই দিন তিনি হয়ে উঠতেন একেবারে ঘরের ছেলে। সহকর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ, সকলেই পেতেন সমান স্নেহ আর আপ্যায়ন। আড্ডা, গান, হাসি আর খাওয়াদাওয়ায় ভরে উঠত দুপুর থেকে সন্ধ্যা। শোনা যায়, কখনও কখনও তিনি নিজেই গেয়ে উঠতেন প্রিয় সুর, আর চারপাশে তৈরি হত এক অন্য রকম মজলিশের আবহ। দোলের রঙে রাঙা সেই মুহূর্তগুলো আজও কিংবদন্তির মতো ভেসে বেড়ায় টলিপাড়ার স্মৃতিতে।
অন্যদিকে মহানায়িকা সুচিত্রা সেন ছিলেন স্বভাবে খানিক আলাদা। রঙের উচ্ছ্বাসে খুব বেশি দেখা যেত না তাঁকে। পরিবারের সঙ্গেই শান্তভাবে দিনটি কাটাতে পছন্দ করতেন তিনি। ফলে প্রশ্ন জাগে, মহানায়ক কি কখনও তাঁকে রং মেখেছিলেন। প্রচলিত গল্প বলছে, ব্যক্তিগত জীবনে একসঙ্গে দোল খেলার দৃশ্য খুব একটা দেখা যায়নি। তবে পর্দায় তাঁদের রসায়নই ছিল আসল রঙের বিস্ফোরণ। বাস্তবের সংযম আর পর্দার আবেগ মিলিয়ে তাঁদের সম্পর্কের আকর্ষণ আরও রহস্যময় হয়ে উঠেছিল দর্শকের চোখে।
উত্তম কুমারের অভিনীত একাধিক ছবিতে বসন্ত আর দোলের আবহ ফিরে এসেছে বারবার। বিশেষ করে সপ্তপদী ছবির সেই দৃশ্য আজও দর্শকের মনে দোলা দেয়, যেখানে কৃষ্ণা আর রীনার প্রেম বসন্তের রঙে একাকার হয়ে যায়। আবার হারানো সুর কিংবা বসন্ত বিলাপ এর গান ও আবহে তাঁর উপস্থিতি বসন্তকে দিয়েছে আলাদা মাত্রা। তাঁর হাসি, চোখের ভাষা আর সংলাপ উচ্চারণ যেন রঙের থেকেও বেশি গভীর ছাপ ফেলত হৃদয়ে। তাই দোল মানেই অনেকের কাছে উত্তম সুচিত্রা জুটির স্মৃতিচারণ।
আরও পড়ুনঃ “ওকে আইসিইউতে নিতে হবে…মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়েছে” নিউমোনিয়ায় সং’কটজনক পার্থপ্রতিম, ডাক্তাররা বলেছিলেন অবস্থা জটিল! দুশ্চিন্তার রাত পার করছেন সোমা বন্দ্যোপাধ্যায়! এখন কেমন আছেন অভিনেত্রীর স্বামী?
সময়ের স্রোতে বহু দশক কেটে গেছে, তবু দোল এলেই বাঙালির ঘরে ঘরে ভেসে ওঠে উত্তম কুমারের ছবি আর গান। অভিনেত্রী সুপ্রিয়া দেবী স্মৃতিচারণায় বলেছিলেন, দোলের দুপুরে গান আর আড্ডায় সবাইকে মাতিয়ে রাখতেন তিনি। নিজের তারকাখ্যাতি ভুলে সাধারণ মানুষের মতো রং খেলায় মেতে উঠতেন। সেই সহজাত আন্তরিকতাই তাঁকে আজও জীবন্ত রাখে ভক্তদের মনে। তাই দোলের আবিরে যখন রঙ লাগে, কোথাও না কোথাও যেন ফিরে আসে মহানায়কের সেই উজ্জ্বল হাসি, আর বসন্ত হয়ে ওঠে আরও একটু বেশি রোমান্টিক।






