“মাতব্বরি করতে গেলেই সৃষ্টি নষ্ট…ক্ষ’তবিক্ষ’ত হলে খুব কষ্ট হয়” দাবি বর্ষীয়ান অভিনেতার! সিনিয়র তকমা লাগিয়ে বহু শিল্পী প্রজন্মের ভেদাভেদের সৃষ্টি করে নিন্দা করেন! সেখানে অভিজ্ঞতার অহং নয়, তরুণদের সঙ্গে সমান তালে মিশতেই কেন বিশ্বাসী পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়?

বাংলা অভিনয় জগতের অন্যতম শ্রদ্ধেয় নাম পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। দীর্ঘ কয়েক দশকের অভিনয় জীবনে তিনি সিনেমা, নাটক ও টেলিভিশন সব ক্ষেত্রেই নিজের দক্ষতার ছাপ রেখেছেন। তাঁর স্বতন্ত্র অভিনয়ভঙ্গি, সংলাপ বলার ভিন্ন ঢং এবং জীবনঘনিষ্ঠ দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে দর্শকদের কাছে আলাদা করে তুলেছে। শুধু অভিনেতা হিসেবেই নয়, একজন অভিজ্ঞ শিল্পী হিসেবে শিল্পের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা এবং চিন্তাভাবনাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে তিনি আবারও সেই গভীরতা এবং স্পষ্ট বক্তব্যের পরিচয় দিয়েছেন।

অনেকদিন পর তিনি আবার ছোটপর্দায় ফিরেছেন স্টার জলসার নতুন ধারাবাহিক ‘সংসারের সংকীর্তন’-এর মাধ্যমে। এই ধারাবাহিকটি বাঙাল-ঘটি সংস্কৃতির মিশেলে তৈরি, যেখানে হাস্যরসের পাশাপাশি রয়েছে পারিবারিক আবহ। তিনি জানান, কিছু ধারাবাহিক সময়ের সঙ্গে হারিয়ে গেলেও কিছু কাজ মানুষের মনে থেকে যায় যার মূল কারণ বিষয়বস্তু এবং অভিনয়ের ব্যতিক্রমী উপস্থাপনা। তাঁর মতে, দর্শক নতুন কিছু খুঁজে পেলে তবেই আগ্রহী হন এবং সেই নতুনত্বই একটি কাজকে দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে। একই সঙ্গে তিনি তাঁর পুরনো জনপ্রিয় ধারাবাহিকগুলোর কথাও উল্লেখ করেন, যেগুলো আজও দর্শকের মনে জায়গা করে আছে।

এই ধারাবাহিকে একাধিক প্রজন্ম একসঙ্গে কাজ করছেন। এই প্রসঙ্গে পরাণবাবুর বক্তব্য খুবই স্পষ্ট, অভিনয়ের ক্ষেত্রে বয়স বা অভিজ্ঞতার পার্থক্য টেনে আনলে শিল্পের ক্ষতি হয়। তিনি বলেন, “আমি তো একদিনে বৃদ্ধ হইনি, ধীরে ধীরে সেই জায়গায় পৌঁছেছি।” তাঁর মতে, সিনিয়র-জুনিয়র ভেদাভেদ না করে সবাইকে সহকর্মী এবং বন্ধু হিসেবে ভাবা উচিত। এই মানসিকতাই একটি ভালো কাজের পরিবেশ তৈরি করে এবং অভিনয়কে আরও স্বাভাবিক করে তোলে।

আরও পড়ুন: রামকৃষ্ণ থেকে শ্রীচৈতন্য সব চরিত্রেই তিনি মন জিতেছেন বাঙালি দর্শকদের! বিজ্ঞানের ছাত্র ছোটপর্দার নতুন ‘চৈতন্য’ স্বর্ণাভকে কেমন লাগে আপনাদের?

শিল্পচর্চার ক্ষেত্রে তিনি বিশেষভাবে তুলে ধরেছেন অযথা ‘মাতব্বরি’ বা অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের প্রবণতার কথা। তাঁর মতে, যখন কোনও সৃষ্টিকে শিল্প হিসেবে না দেখে শুধুমাত্র প্রোডাকশনের দৃষ্টিতে বিচার করা হয়, তখন আসল সৌন্দর্যটাই হারিয়ে যায়। আগে একটি দৃশ্য করার পর জিজ্ঞাসা করা হতো “কেমন হলো?”, অর্থাৎ মান এবং অনুভূতির গুরুত্ব ছিল বেশি। কিন্তু এখন অনেক ক্ষেত্রেই সেই জায়গায় এসেছে “কত হলো?”, অর্থাৎ পরিমাপের হিসাব। এতে শিল্পের প্রতি আন্তরিকতা ও আবেগ কমে যাচ্ছে বলে মনে করেন তিনি। পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, একটি ভালো কাজ তৈরি করতে হলে স্ক্রিপ্টরাইটার, অভিনেতা এবং পুরো টিমকে একসঙ্গে কাজ করতে হয়, এটা সম্পূর্ণ একটি সম্মিলিত প্রক্রিয়া। তিনি বলেন, “অভিনয়ে ক্ষতবিক্ষত হলে খুব কষ্ট হয়।” প্রত্যেকে যদি নিজের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেন এবং অযথা হস্তক্ষেপ না করেন, তবেই একটি সুন্দর ও মানসম্মত সৃষ্টি সম্ভব।

ধারাবাহিকের বিবর্তন এবং বর্তমান সময়ের পরিবর্তন নিয়েও তিনি নিজের মতামত জানিয়েছেন। তাঁর মতে, সময়ের সঙ্গে সবকিছুই বদলাবে এটাই স্বাভাবিক। তবে সেই পরিবর্তনের মধ্যে যদি শিল্পের গুণগত মান বজায় না থাকে, তাহলে কষ্ট হয়। তিনি মনে করেন, ভালো কাজ হলে দর্শক তা গ্রহণ করবেই, আর সেটাই একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। নতুন ধারাবাহিক ‘সংসারের সংকীর্তন’ নিয়েও তিনি আশাবাদী দর্শক ইতিমধ্যেই এটি উপভোগ করছেন, এবং ভবিষ্যতে আরও ভালো প্রতিক্রিয়া পাওয়ার আশা রাখছেন তিনি।

You cannot copy content of this page