অভিনেত্রী রূপালী রাই ভট্টাচার্য (Rupali Rai Bhattacharya) সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বাংলা বিনোদন জগত, শিল্পীদের নিরাপত্তা, আর্টিস্ট ফোরামের পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ নিয়ে একাধিক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর দাবি, ২০১১ সালে সরকার বদলের পর থেকেই টলিউড ও টেলিভিশন ইন্ডাস্ট্রির পরিবেশ বদলাতে শুরু করে। আগে যেখানে শিল্পী সংগঠনগুলি শিল্পীদের পাশে দাঁড়াত, সেখানে ধীরে ধীরে “আনুগত্য, ফেভারিটিজম আর রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা” গুরুত্ব পেতে শুরু করে। শুধু তাই নয়, তিনি সরাসরি অভিযোগ করেছেন যে তৃণমূলের ঘনিষ্ঠ শিল্পীদের কাজ পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যেত এবং অনেকেই রাজনৈতিক ক্ষমতার সুবিধা নিতে শাসকদলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন।
রূপালীর কথায়, “২০১১ সালে সরকার বদলানোর পর তখন ইন্টারফেয়ারেন্স শুরু হলো। তখন মনে হলো এই ইন্ডাস্ট্রি যেন কারও ব্যক্তিগত ঘরবাড়ি হয়ে গেছে।” তিনি দাবি করেন, আগে আর্টিস্ট ফোরাম ছিল সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক একটি সংগঠন, যেখানে শিল্পীদের সমস্যা নিয়ে যৌথভাবে কাজ হতো। কিন্তু ধীরে ধীরে সেখানে রাজনৈতিক প্রভাব বাড়তে থাকে। তাঁর অভিযোগ, “শিল্পীরাও একটা আনুগত্যের জায়গায় চলে গেল। যারা ২১শে জুলাইয়ের মঞ্চে যেত, প্রডিউসার-ডিরেক্টররা ভাবত তাদের নিলে সরকারের কাছ থেকে ফান্ড বা সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।” রূপালীর মতে, এই কারণেই বহু শিল্পী বাধ্য হয়ে বা স্বার্থের জন্য শাসকদলের কাছাকাছি যেতে শুরু করেন। তিনি আরও বলেন, “যেখানে ৫০টা কাজ হতো, সেটা কমে ২০টায় দাঁড়াল। আর সেই ২০টার মধ্যে ১৮টা কাজ কারা করবে সেটা নবান্ন থেকেই ঠিক হয়ে যেত।”
সাক্ষাৎকারে অভিনেত্রী নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন। একটি জনপ্রিয় সুপারন্যাচারাল ধারাবাহিকের শুটিং করতে গিয়ে কীভাবে প্রাণসংকটের মধ্যে পড়েছিলেন, তা বলতে গিয়ে তিনি জানান, তাঁকে তিস্তার খরস্রোতা জলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসিয়ে রাখা হয়েছিল শুধুমাত্র ক্যামেরা সেট করার জন্য। তাঁর অভিযোগ, “আমি সাঁতার জানি না, অথচ পাথরের খাঁজে পা আটকে মাথা নিচু করে জলের তলায় বসিয়ে রাখা হয়েছিল।” আবার অন্য একটি দৃশ্যে হারনেসে ঝুলিয়ে রেখে ইউনিটের অনেকেই সেখান থেকে চলে যান বলেও দাবি করেন তিনি। রূপালীর কথায়, “পুরো শরীর ঝুলছে, কুচকির কাছ থেকে শরীর কেটে যাচ্ছে, আমি চিৎকার করছি নামাও নামাও, কিন্তু কেউ শুনছে না।” তাঁর দাবি, তখন ইন্ডাস্ট্রিতে এমন একটা পরিবেশ তৈরি হয়েছিল যেখানে মুখ খুললেই কাজ হারানোর ভয় ছিল। ফলে অনেক শিল্পী নির্যাতনের শিকার হলেও চুপ করে থাকতে বাধ্য হতেন।
রাজনৈতিক যোগসূত্র নিয়ে কথা বলতে গিয়ে রূপালী আরও বিস্ফোরক মন্তব্য করেন। তিনি সরাসরি বলেন, “তৃণমূলে যারা যায় তারা তো টাকার জন্যই যায়।” তাঁর দাবি, শাসকদলের প্রচারে গেলে অভিনেত্রীদের “২০ লাখ, ২৫ লাখ টাকা” পর্যন্ত দেওয়া হতো। যদিও এই দাবির কোনও সরকারি বা স্বাধীন প্রমাণ তিনি দেননি, তবুও তাঁর মন্তব্য ঘিরে ইতিমধ্যেই জোর বিতর্ক শুরু হয়েছে। তিনি আরও বলেন, “২০১১ সালে আমাকেও তৃণমূলের প্রচারে ডাকেছিল। তখন ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু আমি রাজনীতি করব না বলে ফিরিয়ে দিই।” একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, অনেক শিল্পী ক্ষমতার কাছাকাছি থেকে আর্থিক সুবিধা ও প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, “তারা রাজনীতি করেছে কারণ ক্ষমতায় থাকলে টাকা হবে, অভিনয়ও চলবে।” এই প্রসঙ্গে তিনি অভিনেতা দেব, পরিচালক রাজ চক্রবর্তী-সহ একাধিক তারকার প্রসঙ্গ টেনে প্রশ্ন তোলেন, শিল্পীদের রাজনৈতিক অবস্থান আদৌ আদর্শের জন্য, নাকি শুধুই ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য?
সবচেয়ে বিতর্কিত মন্তব্যটি আসে যখন রূপালী বলেন, “অনেকেই ১১ বছর গাছেরও খেলেন, আবার তলারও কুড়োলেন।” তাঁর বক্তব্য, একসময় যারা শাসকদলের ঘনিষ্ঠ হয়ে সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন, এখন পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করতেই আবার নিজেদের ‘শুধু অভিনেতা’ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। তিনি দাবি করেন, “এখন অনেকের মনে হচ্ছে ভুল করেছি, আবার অভিনয়ে ফিরতে চাই।” একই সঙ্গে তিনি সাংসদ বা বিধায়ক হওয়া শিল্পীদেরও কটাক্ষ করেন। তাঁর প্রশ্ন, “যদি এত জোর করে এমপি বানানো হয়ে থাকে, তাহলে বারবার নির্বাচনে দাঁড়ালেন কেন?” অভিনেত্রী মিমি চক্রবর্তী এবং নুসরাত জাহান-এর প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “তাঁরা হয়তো রাজনীতির মানুষ নন, কিন্তু কেউ যদি বলে ক্ষমতার সঙ্গে না থাকলে সারভাইভ করা যাবে না, সেটা অন্তত সৎ স্বীকারোক্তি হতো।”
আরও পড়ুনঃ “ইন্ডাস্ট্রিতে বড্ড বেশি খেয়োখেয়ি চলছিল.. আবার সোনার ইন্ডাস্ট্রি তৈরি হবে” তৃণমূল আমলেই টলিউডের ভিত নড়ে যাওয়ার আভাস পেয়েছিলেন চিরঞ্জিৎ চক্রবর্তী! রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ইন্ডাস্ট্রির আশায় বিজেপি সরকারের দিকেই তাকিয়ে তৃণমূলী অভিনেতা?
রূপালী রাই ভট্টাচার্যের এই বিস্ফোরক সাক্ষাৎকার সামনে আসতেই নতুন করে প্রশ্ন উঠছে বাংলা বিনোদন জগতের অন্দরমহল নিয়ে। সত্যিই কি রাজনৈতিক প্রভাব এতটাই বেড়েছিল যে শিল্পীদের কাজ, সুযোগ, এমনকি নিরাপত্তাও নির্ভর করত রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার উপর? নাকি এই অভিযোগ শুধুই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ? তাঁর বক্তব্যে একদিকে যেমন উঠে এসেছে শিল্পীদের অনিশ্চয়তা ও ভয়ের ছবি, তেমনই অন্যদিকে উঠে এসেছে টলিউডে ক্ষমতা, প্রভাব ও অর্থের জটিল সমীকরণের অভিযোগ। যদিও এই সমস্ত দাবির বিষয়ে এখনও পর্যন্ত শাসকদল বা যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে তাদের তরফে কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া সামনে আসেনি, তবে রূপালীর এই মন্তব্য ইতিমধ্যেই বাংলা বিনোদন ও রাজনৈতিক মহলে তীব্র চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছে।






