রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর থেকেই বদলে যেতে শুরু করেছে বাংলার সাংস্কৃতিক এবং বিনোদন জগতের পরিবেশ। নতুন বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর টলিউডের অন্দরে বহুদিন ধরে চাপা পড়ে থাকা নানা অভিযোগ এবং অভিজ্ঞতা সামনে আসতে শুরু করেছে। শিল্পীদের একাংশের দাবি, আগের শাসনকালে মত প্রকাশের স্বাধীনতা থেকে শুরু করে কাজের সুযোগ সবকিছুতেই এক ধরনের অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ ছিল। কেউ কোন রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে যুক্ত, কে কার ঘনিষ্ঠ, সেই হিসেবেই নাকি নির্ধারিত হতো সুযোগ ও সম্পর্কের সমীকরণ। এই পরিস্থিতির মধ্যেই সম্প্রতি লাইভে এসে বিস্ফোরক মন্তব্য করেন বিজেপি নেতা ও অভিনেতা রুদ্রনীল ঘোষ। তাঁর বক্তব্য ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক মহলে শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা।
লাইভে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে রুদ্রনীল বলেন, সাধারণ মানুষই আজকের এই পরিবর্তন এনে দিয়েছে। বহু লড়াই, বহু অভিজ্ঞতা এবং দীর্ঘদিনের দমবন্ধ পরিস্থিতির পর মানুষ নতুন পথ বেছে নিয়েছে বলেই আজ পরিবর্তনের হাওয়া বইছে বাংলায়। তাঁর কথায়, “একটা সময় এমন ছিল যেখানে নিঃশ্বাস নিতেও অনুমতি লাগত। স্বপ্ন দেখতে গেলেও দেখতে হতো কে কার লোক। না হলে সেই স্বপ্ন দেখার অধিকারও ছিল না।” অভিনেতার দাবি, এই মানসিকতা শুধু শিল্প সমাজকে নয়, সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রকে ধীরে ধীরে গ্রাস করছিল। তিনি বলেন, স্বাধীনতার অর্থ কখনও স্বেচ্ছাচারিতা নয়, বরং মানুষকে নিজের মতো করে ভাবার এবং কাজ করার সুযোগ দেওয়া। মানুষের মৌলিক অধিকারগুলো ধীরে ধীরে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
রুদ্রনীল আরও জানান, বহু মানুষের সৃষ্টিশীল ভাবনাকে ইচ্ছাকৃতভাবে আটকে রাখা হয়েছিল। তাঁর ভাষায়, “আমি সিনেমা বানাতে চাই, আমি কবিতা লিখতে চাই এই সাধারণ চিন্তাগুলোর উপরও পেরেক মেরে দেওয়া হয়েছিল।” তিনি দাবি করেন, এতদিন ধরে শিল্পীদের এমন একটা পরিবেশে রাখা হয়েছিল যেখানে সবাই না পাওয়াটাকেই স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে শিখে গিয়েছিলেন। তাঁর মতে, “চাইলেই আমার গর্দান যাবে” এই ভয়টাই মানুষের মনে গেঁথে দেওয়া হয়েছিল। সেই কারণেই মানুষ জানলার বাইরে আলো আসতে পারে, সেটাও ভুলে গিয়েছিল। এখন নতুন পরিবর্তনের মাধ্যমে সেই জানলা আবার খুলেছে বলেই মন্তব্য করেন অভিনেতা। তিনি বলেন, এখন মানুষের উচিত নতুন স্বপ্ন দেখা এবং নতুন প্রজন্মকে এগিয়ে যাওয়ার পথ করে দেওয়া।
শুধু শিল্পী নন, সাংবাদিকদের ক্ষেত্রেও নাকি একই ধরনের চাপ কাজ করত বলে দাবি করেছেন রুদ্রনীল। তাঁর অভিযোগ, কোন সাংবাদিক কার সাক্ষাৎকার নেবেন, কার খবর প্রচার করবেন, তা নিয়েও নাকি কড়া নির্দেশ থাকত। অনেক সাংবাদিককে বয়কট করার চেষ্টাও হয়েছে, কারণ তাঁরা নির্ভীকভাবে সত্যিটা মানুষের সামনে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলার কিংবদন্তি শিল্পীরা ভাগ্যিস এই পরিস্থিতি পুরোপুরি দেখে যেতে বাধ্য হননি। তবে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এবং সাবিত্রী চ্যাটার্জী প্রমুখদের মতো শিল্পীদের এই পরিবর্তিত বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, অতীতের শাসনব্যবস্থা শিল্পী, গায়ক, পরিচালক সবার চিন্তাশক্তিকেই ধীরে ধীরে সংকুচিত করে ফেলেছিল।
আরও পড়ুন; অবশেষে স্বস্তিতে শ্রীজাত! কৃষ্ণনগর আদালতে হাজিরা দিয়ে শর্তসাপেক্ষে জামিন পেলেন কবি
অন্যদিকে গায়ক শিলাজিৎ মজুমদার-ও এই প্রসঙ্গে নিজের মতামত প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “একটা বাচ্চা জন্মালে সে কবে মরবে সেটা নিয়ে ভাবার আগে তাকে ভালোবাসা উচিত।” তাঁর মতে, রাজনৈতিক বিভাজনের বদলে এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত ছবির বিষয়বস্তু এবং দর্শকের কাছে পৌঁছনোর প্রয়াসকে। তিনি দাবি করেন, বাংলা ইন্ডাস্ট্রিতে খুব কম সংখ্যক এমন ছবি তৈরি হয় যেগুলো সত্যিই মানুষের মনে দাগ কাটে। তাই শিল্পীদের একসঙ্গে থেকে কাজ করা জরুরি। পাশাপাশি তিনি রূপা গঙ্গোপাধ্যায় এবং রুদ্রনীলের সাহসেরও প্রশংসা করেন। তাঁর মতে, রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলা এবং নিজের অবস্থানে অটল থাকা সহজ নয়, কিন্তু এই দুজন সেই সাহস দেখিয়েছেন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে টলিউডের ভেতরে নতুন করে একতা এবং স্বাধীনতার প্রশ্ন উঠে আসছে। একাংশ মনে করছেন, দীর্ঘদিনের ভয় এবং চাপে থাকা শিল্পজগৎ এখন নতুনভাবে নিজেদের গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। আবার অন্য অংশের মতে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সংস্কৃতি জগতেও নতুন বিভাজন তৈরি হতে পারে। তবে রুদ্রনীল এবং শিলাজিতের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট বাংলার শিল্প ও সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ নিয়ে এখন নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। শিল্পীরা চাইছেন এমন একটি পরিবেশ, যেখানে মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, সৃষ্টিশীলতার উপর কোনও অদৃশ্য চাপ থাকবে না এবং সবাই একসঙ্গে কাজ করে বাংলা ইন্ডাস্ট্রিকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারবেন।






