আরজি কর কাণ্ড নতুন করে সামনে আসতেই আবারও কর্মক্ষেত্রে নারীদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে সরব হল টলিউড। বুধবার টেকনিশিয়ান স্টুডিয়োয় গিয়ে বিজেপি বিধায়ক পাপিয়া অধিকারী মহিলা শিল্পীদের নিরাপত্তা নিয়ে আশ্বাস দেন। তিনি জানান, রাত করে শুটিং শেষ হলে অভিনেত্রীদের নিরাপদে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা উচিত। এর মধ্যেই আরজি কর মামলাও নতুন করে খোলার সিদ্ধান্ত ঘিরে আলোচনায় রাজনৈতিক মহল। এই দুই ঘটনার পরেই বাংলা বিনোদন জগতের অভিনেত্রীরা নতুন করে আশার আলো দেখছেন। তাঁদের বক্তব্য, এবার অন্তত কর্মক্ষেত্রে মহিলাদের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হোক। সেই কারণেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং নারী ও শিশুকল্যাণ মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালের কাছে আবেদন জানানোর পরিকল্পনা করছে টলিউডের একাংশ।
২০২৪ সালের অগস্টে আরজি কর হাসপাতালে তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ ও মৃত্যুর ঘটনা রাজ্যজুড়ে তীব্র আলোড়ন ফেলেছিল। সেই ঘটনার পর থেকেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করে, কর্মস্থলে মহিলারা আদৌ কতটা নিরাপদ। এই ঘটনার প্রভাব পড়েছিল টলিউডেও। কারণ শুটিং ফ্লোরে বা কাজের সূত্রে নানা ধরনের হেনস্থার মুখোমুখি হতে হয় অভিনেত্রী এবং শিশুশিল্পীদের। সেই সময় ইন্ডাস্ট্রির একাধিক পরিচিত মহিলা মুখ একত্রিত হয়ে তৈরি করেছিলেন ‘উইমেনস ফোরাম ফর স্ক্রিন ওয়ার্কার্স’। প্রায় ১০০ জন মহিলা তারকার স্বাক্ষর করা একটি আবেদন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছেও পাঠানো হয়েছিল। সেখানে অভিনেত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একাধিক দাবি জানানো হয়। যদিও সেই আবেদন নিয়ে আর কোনও পদক্ষেপ হয়নি বলেই অভিযোগ।
সম্প্রতি পরিচালক দেবালয় ভট্টাচার্যের বিরুদ্ধে অভিনেত্রী অঙ্কিতা চক্রবর্তীর অশালীন আচরণের অভিযোগ সামনে আসার পর বিষয়টি আবার নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে। এর আগেও টলিউডে বিভিন্ন পরিচালক ও প্রযোজকের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ শোনা গিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে অভিনেত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে আবারও আলোচনা শুরু হয়েছে ইন্ডাস্ট্রির অন্দরে। আনন্দবাজার ডট কমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অভিনেত্রী ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত বলেন, “অবশ্যই বিষয়টি নতুন মুখ্যমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরা উচিত। অভিনেত্রীরা যে কোনও সময়ে কলটাইম পান। অনেক সময়ে ভোররাতে শুটে বেরোতে হয়। আবার শুট শেষ হতে অনেক রাত হয়ে যায়।” তাঁর আরও বক্তব্য, “আমি যেহেতু অভিনেত্রী, তাই আমার পেশার সঙ্গে যুক্ত মহিলাদের সুরক্ষার বিষয়টির উপরে আগে জোর দেব।” শুধু বিনোদন জগত নয়, সব কর্মক্ষেত্রেই নারীদের নিরাপত্তা বাড়ানো প্রয়োজন বলেও মত তাঁর।
অভিনেত্রী ও পরিচালক চৈতি ঘোষাল জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি জানেন, নানা ধরনের সমস্যার মুখে পড়তে হয় মহিলা শিল্পীদের। তাঁর কথায়, “অগ্নিমিত্রা এই সব বিষয়ে খুবই সরব এবং সজাগ। উনি এখন নারী ও শিশুকল্যাণ মন্ত্রী। তাই ওঁর সঙ্গে আমাদের কমিটির কথা, টলিউডে কাজ করতে আসা মহিলা অভিনেত্রীদের সুরক্ষার কথা আলোচনা করা উচিত।” চৈতি আরও জানান, শুধুমাত্র যৌন হেনস্থা নয়, অনেক সময় ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতেও শুটিং করতে হয় শিল্পীদের। সেই বিষয়গুলিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। অভিনেত্রী উষসী রায়ও একই সুরে বলেন, “আমরা কমবেশি সবাই জানি, ইন্ডাস্ট্রিতে কী কী ঘটে। তাই নতুন যাঁরা কাজে আসছেন, তাঁদের সুরক্ষিত রাখতেও পুরনো কমিটি নতুন করে গঠন হলে ভাল হয়।”
আরও পড়ুনঃ “ভানুদা আমায় জুতো কিনে দিয়ে এমন একটা কথা বলেছিলেন, যা আজও কানে বাজে…” অভিনয় জীবনে শুরুতেই সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়কে কী বলেছিলেন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, যে স্মৃতি আজও ভোলেননি বাংলা সিনেমার কিংবদন্তি অভিনেত্রী?
অভিনেত্রী রূপাঞ্জনা মিত্র জানিয়েছেন, এই উদ্যোগ কোনও রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে নয়, বরং সচেতন নাগরিক হিসেবে নারীদের নিরাপত্তার দাবি থেকেই নেওয়া হচ্ছে। তাঁর মতে, নিজের নিরাপত্তা চাওয়া প্রত্যেক মহিলার মৌলিক অধিকার। সেই কারণেই নতুন করে মুখ্যমন্ত্রী এবং নারী ও শিশুকল্যাণ মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার পরিকল্পনা করছেন তাঁরা। টলিউডের মহিলা শিল্পীরা চাইছেন, শুটিং ফ্লোরে কাজের পরিবেশ আরও নিরাপদ হোক। বিশেষ করে রাতের শুটিং, যাতায়াত এবং কর্মক্ষেত্রে আচরণ নিয়ে স্পষ্ট নিয়ম তৈরি করার দাবিও উঠছে। এখন দেখার, তাঁদের এই আবেদন প্রশাসনের তরফে কতটা গুরুত্ব পায়। তবে দীর্ঘদিন পর এই বিষয়টি নিয়ে আবারও সরব হয়েছেন টলিউডের অভিনেত্রীরা।






