টলিউডে বহুদিন ধরেই ফেডারেশন রাজনীতি এবং তথাকথিত ‘ব্যান কালচার’ নিয়ে নানা বিতর্ক ঘুরছে। সেই আবহেই বিস্ফোরক মন্তব্য করলেন অভিনেতা ও পরিচালক পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় (Parambrata Chattopadhyay)। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেছেন, তিনি কখনও সরাসরি তৃণমূলের রাজনীতি করেননি, বরং নিজের কাজ এবং পেশা বাঁচিয়ে রাখতেই রাজনৈতিক মহলের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলতে হয়েছিল তাঁকে। অভিনেতার অভিযোগ, ফেডারেশনের তথাকথিত ‘একুশে আইন’-এর বিরুদ্ধে মুখ খোলার পর থেকেই তাঁর জীবনে কঠিন সময় নেমে আসে। ধীরে ধীরে কাজের সুযোগ কমতে থাকে এবং পরিচালনার ক্ষেত্রেও বাধার মুখে পড়তে হয় তাঁকে। পরমব্রতের কথায়, “নিজের পেশা ও জীবিকা টিকিয়ে রাখার জন্য ‘সেটেলমেন্ট’ করতে হয়েছিল।”
সেই পরিস্থিতি যে তাঁকে ভিতর থেকে অপমানিত করেছিল, সেটাও স্পষ্ট করে জানিয়েছেন অভিনেতা। তাঁর এই মন্তব্য ঘিরে ইতিমধ্যেই টলিপাড়ায় নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। এদিন সাক্ষাৎকারে পরমব্রত জানান, প্রতিবাদ করার পর শুধু অভিনয় নয়, তাঁর প্রযোজনা সংস্থাও বড় আর্থিক সমস্যার মধ্যে পড়ে যায়। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছিল যে, বাড়ি বিক্রি করার কথাও ভাবতে হয়েছিল তাঁকে! এমনকি ক্ষমা চেয়ে ভিডিও বার্তা দেওয়ার পরেও অবস্থার খুব একটা বদল হয়নি বলেই দাবি করেন তিনি। অভিনেতার কথায়, তিনি মনে করেছিলেন, যদি তৃণমূল আবার ক্ষমতায় ফিরত, তাহলে হয়তো ফেডারেশনের ভিতরে তৈরি হওয়া ‘ব্যান সংস্কৃতি’ নিয়ে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হত।
বিশেষ করে স্বরূপ বিশ্বাস (Swarup Biswas)-কে ঘিরে যে অসন্তোষ দীর্ঘদিন ধরে ইন্ডাস্ট্রির অন্দরে চলছিল, তা নিয়েও তিনি নাকি কিছু ইঙ্গিত পেয়েছিলেন। পরমব্রতের দাবি, অরূপ বিশ্বাস এই পুরো বিষয় থেকে নিজেকে অনেকটাই দূরে রাখতেন এবং বিষয়টি মূলত তাঁর ভাইয়ের উপরেই ছেড়ে দিয়েছিলেন। এই মন্তব্যের পর নতুন করে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মহলে চর্চা শুরু হয়েছে। অভিনেতা আরও দাবি করেন, একসময় কয়েকজন প্রযোজককে দিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে চিঠি লিখিয়েছিলেন স্বরূপ বিশ্বাসকে নির্বাচনে প্রার্থী করার দাবিতে। সেই সময় থেকেই নাকি ইন্ডাস্ট্রির ভিতরে একটা ধারণা তৈরি হয়েছিল যে, ভবিষ্যতে স্বরূপ বিশ্বাসকে ঘিরে বড় কোনও পরিবর্তন আসতে পারে।
সাক্ষাৎকারে পরমব্রতকে সরাসরি প্রশ্ন করা হয়, তিনি কি স্বরূপ বিশ্বাসকে ভয় পেতেন? তাঁর দাবি, বহু মানুষ প্রকাশ্যে কিছু বলেননি কারণ তাঁরা সমঝোতার রাস্তা বেছে নিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি প্রতিবাদ করেছিলেন বলেই সবচেয়ে বেশি সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছে তাঁকে। এই প্রসঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দেন, অনেকেই পরিস্থিতি বুঝে চুপ থাকলেও তিনি লড়াইয়ের পথ বেছে নিয়েছিলেন। সেই কারণেই তাঁর কেরিয়ারেও বড় প্রভাব পড়ে। প্রসঙ্গত, গত কয়েক বছরে টলিউডের ফেডারেশন রাজনীতি নিয়ে একাধিক পরিচালক, অভিনেতা এবং কলাকুশলী মুখ খুলেছেন। আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে সেই বিতর্ক। কাজের স্বাধীনতা, শুটিংয়ের সিদ্ধান্ত কিংবা শিল্পীদের উপর চাপ তৈরি করা নিয়ে বারবার অভিযোগ উঠেছে।
সেই সব মামলার সঙ্গেও পরমব্রতের নাম জড়িয়েছিল। অভিনেতার রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও বরাবর আলোচনা হয়েছে। কখনও তাঁকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে দেখা গিয়েছে, আবার কখনও আরজি কর-কাণ্ডে প্রতিবাদ মিছিলে হাঁটতেও দেখা গিয়েছে তাঁকে। তবে তিনি বরাবরই দাবি করেছেন, কোনও রাজনৈতিক দলে সরাসরি যোগ না দিয়েও সমাজ ও গণতন্ত্র নিয়ে কথা বলা জরুরি। ভাষা, নাগরিক অধিকার এবং সামাজিক বিষয়েও বিভিন্ন সময়ে সরব হয়েছেন তিনি। সেই কারণেই তাঁর সাম্প্রতিক এই সাক্ষাৎকারকে অনেকেই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন। সাক্ষাৎকারের শেষ অংশে স্বরূপ বিশ্বাসকে নিয়ে করা প্রশ্নের উত্তরে পরমব্রতের বক্তব্য আরও আবেগঘন হয়ে ওঠে।
আরও পড়ুনঃ “সেই যন্ত্র’ণায় আমি একা না, আমার বউ ছেলেও কেঁদেছে…ভয়ে পেয়ে শিরদাঁড়া বিক্রি করিনি” রোজগার বন্ধ দীর্ঘদিন, রাতভর হাহাকার! চরম আর্থিক সংকটের মধ্যেও লড়াই চালিয়ে গিয়েছেন সুমন ব্যানার্জি! স্ত্রী ও সন্তানকেও ভুগতে হয়েছে অনেক, তবুও তৃণমূলের কাছে মাথা নত করেননি! সব অভিজ্ঞতা নিয়ে, মুখ খুললেন অভিনেতা?
তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়, আজ যদি স্বরূপ বিশ্বাসের সামনে দাঁড়িয়ে কিছু বলতে হয়, তাহলে কী বলবেন? উত্তরে অভিনেতা স্পষ্ট বলেন, “আমি অপমানটা ভুলিনি। আমি আমার সতীর্থদের ফেলে, দূরে চলে আসার দুঃখটা ভুলিনি। আমি আমার টেকনিশিয়ানদের সঙ্গে কাজ না করতে পারার দুঃখটা ভুলিনি। কোনওদিন ভুলব না।” তাঁর এই মন্তব্য টলিউডের অন্দরের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ এবং চাপা অসন্তোষকে আরও সামনে এনে দিয়েছে বলে মনে করছেন অনেকেই। একই সঙ্গে এই সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে, ক্ষমতার বলয়, সমঝোতা এবং শিল্পীদের কাজের স্বাধীনতা নিয়ে টলিউডের ভিতরে কতটা চাপা টানাপোড়েন চলছিল। এখন এই বিস্ফোরক মন্তব্যের পর নতুন করে কী প্রতিক্রিয়া আসে, সেদিকেই নজর ইন্ডাস্ট্রির।






