একসময় তৃণমূল নেতা অরূপ বিশ্বাসের ভাই হিসেবেই বেশি পরিচিত ছিলেন স্বরূপ বিশ্বাস। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি টলিউডের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠেন। টালিগঞ্জে কেবল লাইনের ব্যবসা, অটো ইউনিয়নের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সুরুচি সংঘের মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকার মাধ্যমে নিজের প্রভাব বিস্তার করেছিলেন তিনি। ২০১১ সালে রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর তাঁর গুরুত্ব আরও বাড়ে। সেই সময় থেকেই তিনি ফেডারেশনের নেতৃত্বে আসেন এবং ধীরে ধীরে টলিপাড়ার অন্যতম ক্ষমতাশালী মুখ হয়ে ওঠেন। টেকনিশিয়ানদের স্বার্থরক্ষার নামে একাধিক নতুন নিয়ম চালু করেছিলেন তিনি। সেই নিয়মগুলিই পরবর্তীতে তাঁকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে।
ফেডারেশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর স্বরূপ বিশ্বাস টলিউডে কাজের ক্ষেত্রে একাধিক বাধ্যতামূলক নিয়ম চালু করেন। ছবি, সিরিয়াল বা ওটিটি প্রজেক্টে নির্দিষ্ট সংখ্যক টেকনিশিয়ান নিয়োগের নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রযোজক বা পরিচালকের প্রয়োজন থাকুক বা না থাকুক, সেই নিয়ম মানতেই হত। এর ফলে বড় প্রযোজনাগুলির ক্ষেত্রে খুব একটা সমস্যা না হলেও স্বাধীন এবং স্বল্প বাজেটের নির্মাতারা চাপে পড়েন। ইন্ডাস্ট্রির একাংশের দাবি ছিল, এই ধরনের নিয়মের কারণে বাংলা সিনেমার খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। অনেক প্রযোজক এবং বাইরের সংস্থাও বাংলা ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করতে অনীহা দেখাতে শুরু করেন। সেই সময় থেকেই ফেডারেশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে।
২০২৪ সালে পরিচালক রাহুল মুখোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে ‘গুপি শুটিং’-এর অভিযোগ এনে নতুন বিতর্কের জন্ম দেন স্বরূপ। তাঁর অভিযোগ ছিল, রাহুল খুব কম সংখ্যক কলাকুশলী নিয়ে বাংলাদেশে শুটিং করেছেন এবং ফেডারেশনকে সে বিষয়ে জানাননি। সেই ঘটনার পর থেকেই ‘গুপি শুটিং’ শব্দবন্ধটি টলিউডে বহুল আলোচিত হয়ে ওঠে। এরপর কর্মবিরতি, শুটিং বন্ধ এবং পরিচালক-প্রযোজকদের সঙ্গে সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হয়। সৃজিত মুখোপাধ্যায়, কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, অনির্বাণ ভট্টাচার্য এবং দেবের মতো বহু পরিচিত নাম এই বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন। ইন্ডাস্ট্রি কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। একদিকে ছিলেন কলাকুশলীরা, অন্যদিকে পরিচালক ও প্রযোজকদের একাংশ।
পরবর্তীকালে ‘ব্যান কালচার’ নিয়েও বিস্তর বিতর্ক তৈরি হয়। অভিযোগ ওঠে, ফেডারেশনের সঙ্গে মতবিরোধ হলে অনেক শিল্পী ও পরিচালকের কাজ পাওয়া কঠিন হয়ে যেত। কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় ও পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় পরে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইলেও অনির্বাণ ভট্টাচার্য এবং ঋদ্ধি সেন সেই পথে হাঁটেননি বলে চর্চা শুরু হয়। এদিকে অভিনেতা ও সাংসদ দেব প্রকাশ্যে এই সংস্কৃতির বিরোধিতা করেন। অনির্বাণকে নিয়ে ‘দেশু ৭’ ছবির কাজ শুরু করে তিনি আলোচনায় আসেন। সেই সময় স্বরূপ বলেছিলেন, “আমাদের, অর্থাৎ ফেডারেশনে এসে সরাসরি কেউ কিন্তু কিচ্ছু জানাননি। কে বা কারা অনির্বাণকে সমর্থন জানাচ্ছেন, সেটা কিন্তু সংবাদমাধ্যমের মারফত জানছি।” এই মন্তব্যও নতুন করে বিতর্ক উসকে দেয়।
আরও পড়ুনঃ যে খরাজ মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠস্বরে মুগ্ধ সবাই, সেই গলাই পছন্দ হয়নি অনীক দত্তর! এতটাই পারফেকশনিস্ট ছিলেন যে রাতারাতি বদলে গেল গলা! ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’-এ খরাজ মুখার্জির গলা ডাব করেছিলেন কে জানেন? জানলে চমকে যাবেন!
শুধু টলিউড নয়, বাংলাদেশের অভিনেতা শাকিব খানকে ঘিরেও স্বরূপ বিশ্বাসের নাম উঠে আসে। প্রযোজক শিরিন সুলতানার অভিযোগ ছিল, কলকাতায় শুটিংয়ের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত পারিশ্রমিকের দাবি করা হয়েছিল। শিরিনের কথায়, “এর পরেই স্বরূপবাবু হঠাৎ একদিন ফোন করে জানান, তিন গুণ বেশি পারিশ্রমিক দিতে হবে টেকনিশিয়ানদের। না হলে কাজ বন্ধ।” ২০২৬ সালে সরকার বদলের পর স্বরূপ বিশ্বাস ফেডারেশনের পদ থেকে সরে দাঁড়ান। পরে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনও আলোচনায় আসে এবং স্ত্রী জুঁই বিশ্বাস বিবাহবিচ্ছেদের মামলা করেন। এরপর এক মহিলা রূপটানশিল্পীর অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। অভিযোগকারিণীর দাবি, অভিযোগ জানানোর পর তাঁকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে গোটা বিষয়টি তদন্তাধীন এবং স্বরূপ বিশ্বাসকে ঘিরে একের পর এক অভিযোগের সত্যতা খতিয়ে দেখছে তদন্তকারী সংস্থা।






