পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পালাবদলের পর তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে অস্বস্তি ক্রমশ বাড়ছে। দলের একাংশের ক্ষোভ এখন প্রকাশ্যেই সামনে আসতে শুরু করেছে। সেই আবহে বীরভূমের চারবারের সাংসদ ও অভিনেত্রী শতাব্দী রায়কে ঘিরে নতুন রাজনৈতিক জল্পনা তৈরি হয়েছে। কখনও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের বাড়িতে যাওয়া, কখনও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে বৈঠক, আবার কখনও নিজের দিল্লির বাসভবনে ‘বিদ্রোহী’ সাংসদদের বৈঠকের আয়োজন করে তিনি রাজনৈতিক মহলের নজর কেড়েছেন। এর ফলে তৃণমূলের সংসদীয় দলের ভাঙন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন অনেকে। বিশেষ করে ‘অন্তর্ধান’ খ্যাত এই অভিনেত্রী এখন দলের বিক্ষুব্ধ অংশের অন্যতম মুখ হয়ে উঠেছেন বলেই রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে। তাঁর সাম্প্রতিক পদক্ষেপ ঘিরে দলীয় অন্দরে উদ্বেগও বাড়ছে।
গত ৪ মে বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর তৃণমূলের ভরাডুবি নিয়ে প্রথম প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেন বারাসতের সাংসদ কাকলি ঘোষদস্তিদার। এরপর ধীরে ধীরে দলের ভিতরে অসন্তোষ আরও বাড়তে থাকে। বিরোধী দলনেতার পদ নিয়েও নতুন সমীকরণ তৈরি হয়। এই সময় শতাব্দী রায় প্রথমে খুব বেশি মন্তব্য না করলেও পরে সক্রিয় ভূমিকা নিতে শুরু করেন। তিনি প্রকাশ্যে জানান যে, নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটকে সমর্থন করার পক্ষেই তাঁরা রয়েছেন। এই মন্তব্য সামনে আসতেই রাজনৈতিক মহলে নানা জল্পনা শুরু হয়। অনেকেই মনে করতে শুরু করেন, ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সমীকরণে শতাব্দী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে চলেছেন। তাঁর একের পর এক পদক্ষেপ সেই ধারণাকে আরও জোরদার করেছে।
নির্বাচনের ফল ঘোষণার প্রায় এক মাস পরে শতাব্দীর দিল্লির বাসভবনে একত্রিত হন একাধিক বিক্ষুব্ধ সাংসদ। ৪ জুন সেখানে যান পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। দীর্ঘ বৈঠকের পর বেরিয়ে যাওয়ার সময় তাঁকে জয়ের চিহ্ন দেখাতেও দেখা যায়। এরপর ১২ জুন ১৯ জন ‘বিদ্রোহী’ সাংসদের স্বাক্ষর করা একটি নথি সামনে আসে। সেখানে কাকলি ঘোষদস্তিদারের নামের পরই ছিল শতাব্দী রায়ের স্বাক্ষর। এছাড়াও ছিলেন বাপি হালদার, শর্মিলা সরকার, প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়, জগদীশ বসুনিয়া, অসিত মাল, অরূপ চক্রবর্তী, কালীপদ সরেন, দেব অধিকারী, জুন মালিয়া, পার্থ ভৌমিক, খলিলুর রহমান, আবু তাহের খান, ইউসুফ পাঠান, মিতালি বাগ এবং মালা রায়। সূত্রের দাবি, পরে আলাদা ভাবে সেই নথিতে স্বাক্ষর করেন রচনা বন্দ্যোপাধ্যায় ও সায়নী ঘোষও। যদিও সেখানে সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম ছিল না।
১৩ জুন আচমকাই দিল্লি যান কলকাতা উত্তরের সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়। একই বিমানে ছিলেন শতাব্দী রায়ও। রাজধানীতে পৌঁছে দু’জনকে একই গাড়িতে করে ভূপেন্দ্র যাদবের বাড়িতে যেতে দেখা যায়। পরে তাঁরা অটল অক্ষয় উরজা ভবনেও যান এবং অমিত শাহের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। রাজনৈতিক মহলের মতে, এই ঘটনা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় দীর্ঘদিন তৃণমূলের সংসদীয় দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ ছিলেন। ছয়বারের সাংসদ এবং চারবারের বিধায়ক হিসেবে তাঁর অভিজ্ঞতা যথেষ্ট। তাই তাঁকে পাশে পাওয়ার চেষ্টা বিক্ষুব্ধদের জন্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সুদীপের স্ত্রী নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়ও বাংলা চলচ্চিত্র জগতের পরিচিত মুখ হওয়ায় অভিনেত্রী সাংসদদের সঙ্গে সম্পর্কের সমীকরণ নিয়েও নানা আলোচনা শুরু হয়েছে।
আরও পড়ুন: “মদিনায় নয়, সায়নী ঘোষকে পাঠাতে হবে অযোধ্যায়, ওর নৌকার পাল কেটে ফেলতে হবে” তী’ব্র কটা’ক্ষ হাস্যকৌতুক অভিনেতা সঞ্জয় বিশ্বাসের! মমতা ব্যানার্জির ঘনিষ্ঠ হয়ে রাজনৈতিক সুবিধা পেতেই কি নিজের অবস্থান বদলেছিলেন সায়নী ঘোষ, কী অভি*যোগ তুললেন অভিনেতা?
কলকাতা ছাড়ার আগে শতাব্দী রায় সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবনযাপন একেবারেই পছন্দ করেনি আমজনতা।” পাশাপাশি তিনি নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর প্রশংসাও করেন। তাঁর দাবি, বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পকে ঘুরে দাঁড় করাতে এবার সেই জগতের সঙ্গে যুক্ত মানুষদের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে, যা গত ১৫ বছরে হয়নি। তবে শতাব্দী দাবি করেন, নির্বাচনের ফল ঘোষণার পরই তিনি বিদ্রোহী হয়ে যাননি। তাঁর বক্তব্য, দলের বৈঠকগুলিতে হারের কারণ নিয়ে কোনও আত্মসমালোচনা হয়নি। বরং সাংসদদের ডেকে নিজেদের বক্তব্যই শুনিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই কারণেই তিনি আলাদা অবস্থান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে অন্য অনেক বিক্ষুব্ধ নেতার মতো তিনি সরাসরি দলনেত্রী বা অভিষেকের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক মন্তব্য করেননি।
রাজনীতিতে আসার আগে শতাব্দী রায় ছিলেন বাংলা সিনেমার অত্যন্ত জনপ্রিয় অভিনেত্রী। ১৯৮৬ সালে তপন সিংহ পরিচালিত ‘আতঙ্ক’ ছবির মাধ্যমে তাঁর অভিনয় জীবন শুরু হয়। এরপর প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের বিপরীতে অভিনয় করে তিনি দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। ১৯৮৭ সালে শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব চরিত্রের পুরস্কারও পান। ১৯৯১ সালে মুক্তি পাওয়া ‘অন্তর্ধান’ ছবিও তাঁকে দর্শকদের কাছে আরও পরিচিত করে তোলে। ২০০৯ সালে প্রথমবার বীরভূম থেকে সাংসদ নির্বাচিত হন তিনি, যখন রাজ্যে এখনও বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় ছিল। এরপর ২০১৪, ২০১৯ এবং ২০২৪ সালেও তিনি জয়ী হন। বীরভূমে অনুব্রত মণ্ডলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বহুদিন ধরেই ওঠানামার মধ্যে ছিল। অনুব্রতকে নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশ্যে অসন্তোষও প্রকাশ করেছিলেন তিনি।
সম্প্রতি তিনি বলেন, “অনুব্রত মণ্ডলকে নিয়ে যখনই অভিযোগ করেছি, তখন প্রকাশ্যে ওঁকেই সমর্থন করেছে দল। রাজনৈতিক মঞ্চেও সে কথা বলা হয়েছে। তবে বীরভূমে তৃণমূলের সংগঠন তৈরি করার ক্ষেত্রে অনুব্রতের অবদান রয়েছে। সে দিক থেকে বলব, দিদি ঠিক আমি ভুল।” রাজনৈতিক পরিস্থিতি যেদিকে এগোচ্ছে, তাতে আগামী দিনে শতাব্দী রায় এবং তাঁর সঙ্গে থাকা সাংসদদের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।






