বাংলার সংস্কৃতি শুধু একটি অঞ্চলের পরিচয় নয়, এটি একটি আবেগ, একটি ঐতিহ্য এবং বহু প্রজন্ম ধরে বহন করে চলা জীবনযাত্রার অংশ। বাংলা ভাষা, সাহিত্য, গান, উৎসব, পোশাক কিংবা সামাজিক রীতিনীতি সবকিছুর মধ্যেই রয়েছে নিজস্ব স্বকীয়তা। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বায়নের প্রভাবে বিভিন্ন সংস্কৃতির আদান-প্রদান যেমন বেড়েছে, তেমনই অনেকের মতে নিজের সংস্কৃতির চর্চা এবং সংরক্ষণের প্রবণতা কিছুটা কমেছে। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের জীবনযাপন, উৎসব উদ্যাপন এবং সামাজিক অনুষ্ঠানে সেই পরিবর্তনের ছাপ স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে। এই পরিবর্তন নিয়েই সম্প্রতি নিজের মতামত প্রকাশ করেছেন প্রবীণ অভিনেতা ফাল্গুনী চ্যাটার্জী।
বাংলা চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন জগতের পরিচিত মুখ ফাল্গুনী চ্যাটার্জী। দীর্ঘ অভিনয় জীবনে তিনি অসংখ্য চরিত্রের মাধ্যমে দর্শকদের মন জয় করেছেন। শুধু অভিনেতা হিসেবেই নয়, বরং তাঁর স্পষ্টভাষী, সহজ-সরল এবং অকপট মন্তব্যের জন্যও তিনি বরাবরই পরিচিত। সমাজ, সংস্কৃতি কিংবা সমসাময়িক নানা বিষয় নিয়ে নিজের মত প্রকাশ করতে তিনি কখনও পিছপা হন না। তাঁর বক্তব্যে যেমন থাকে অভিজ্ঞতার ছাপ, তেমনই থাকে নিজের শিকড়ের প্রতি গভীর টান। সম্প্রতি বাংলা সংস্কৃতি এবং বাঙালিয়ানার বর্তমান অবস্থান নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি তুলে ধরেছেন নিজের উদ্বেগ ও অনুভূতির কথা।
ফাল্গুনী চ্যাটার্জী বলেন, বাংলা ভাষা ও বাংলার সংস্কৃতির প্রতি তাঁর এক অদ্ভুত দুর্বলতা রয়েছে। তাঁর মতে, সেই টান হয়তো অনেকের চোখে একটু বেশি বলেও মনে হতে পারে। কিন্তু তিনি বিশ্বাস করেন, নিজের সংস্কৃতিকে ভালোবাসা এবং তাকে সম্মান করা অত্যন্ত জরুরি। অভিনেতার আক্ষেপ, বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রেই বাঙালির নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয় ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছে। বিশেষ করে সামাজিক অনুষ্ঠানগুলিতে সেই পরিবর্তন আরও স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। তিনি মনে করেন, আজকের দিনে বাঙালির অনেক অনুষ্ঠানেই অন্য সংস্কৃতির প্রভাব এতটাই বেড়েছে যে অনেক সময় নিজের ঐতিহ্যকেই আর খুঁজে পাওয়া যায় না।
আরও পড়ুন: “প্রতিভা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই, কিন্তু এটা…” “একেবারেই মানতে পারছি না, এই পরিবর্তনটা আশা করিনি!” নজরুলগীতিতে নেচে বিত’র্কের মুখে ‘পান্তাভাতের কুণ্ডু’ দীপান্বিতা, সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনার ঝড়! কী এমন করলেন যে হঠাৎ উত্তাল নেটপাড়া?
এই প্রসঙ্গে তিনি বিয়ের অনুষ্ঠানের উদাহরণ তুলে ধরেন। ফাল্গুনী চ্যাটার্জীর কথায়, একসময় বাঙালি বিয়েতে যে নিজস্বতা ছিল, এখন তার অনেকটাই বদলে গেছে। তিনি বলেন, বর্তমানে অনেক বিয়েতে সংগীত অনুষ্ঠান, লেহেঙ্গা, ঘাঘরা বা পাগড়ির মতো পোশাকের ব্যবহার দেখা যায়, যা মূলত অন্য সংস্কৃতির অংশ। তাঁর মতে, অন্য সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা থাকা উচিত, কিন্তু নিজের সংস্কৃতিকে ভুলে গিয়ে অন্যকে অনুকরণ করা ঠিক নয়। তিনি প্রশ্ন তোলেন, অন্য রাজ্যের মানুষ কি নিজেদের ঐতিহ্য ছেড়ে বাঙালির মতো বিয়ে করেন? যদি না করেন, তাহলে বাঙালিরাই বা কেন নিজেদের সংস্কৃতি থেকে দূরে সরে যাবে? অভিনেতার মতে, বাঙালির সবচেয়ে বড় সমস্যা হল নিজেদের ঐতিহ্যকে অনেক সময় নিজেরাই যথেষ্ট গুরুত্ব দিতে পারে না।
তবে ফাল্গুনী চ্যাটার্জী স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, তিনি কোনও সংস্কৃতির বিরোধী নন। তাঁর মতে, প্রত্যেক সংস্কৃতির নিজস্ব সৌন্দর্য ও ঐতিহ্য রয়েছে, আর তা সম্মান পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু সেই সম্মান যেন নিজের সংস্কৃতিকে বিসর্জন দিয়ে না আসে। অভিনেতার কথায়, “ওদের সংস্কৃতি ওদের কাছে থাকুক, আমার সংস্কৃতি আমার কাছে থাকুক।” এখানেই তিনি বাঙালিদের ‘আত্মবিস্মৃত জাতি’ বলেও উল্লেখ করেন। তাঁর ব্যাখ্যা, বাঙালিরা অনেক সময় নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের গুরুত্ব ভুলে গিয়ে অন্যের সংস্কৃতিকে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করে। সেই প্রবণতাকেই তিনি ‘আত্মবিস্মৃতি’ হিসেবে দেখছেন। ফাল্গুনীর মতে, নিজের পরিচয়কে সম্মান না করে শুধুমাত্র অন্যকে অনুসরণ করার মানসিকতা দীর্ঘমেয়াদে সাংস্কৃতিক সংকট তৈরি করতে পারে। বাংলার বর্তমান পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, আজ যে পরিবর্তন চোখে পড়ছে, তার পেছনেও এই মানসিকতার প্রভাব রয়েছে। তাই আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়েও নিজের শিকড়, ভাষা ও সংস্কৃতিকে মর্যাদা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রবীণ এই অভিনেতা।






