সন্তানকে মানুষ করার ক্ষেত্রে অভিভাবকদের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা মতামত রয়েছে। কেউ মনে করেন কঠোর শাসন ছাড়া সন্তানকে সঠিক পথে রাখা যায় না, আবার অনেকেই বিশ্বাস করেন বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কই সন্তানকে সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তা ও আত্মবিশ্বাস দেয়। বর্তমান সময়ে যখন পরিবারে প্রজন্মগত দূরত্ব, যোগাযোগের অভাব এবং মানসিক চাপ নিয়ে নানা আলোচনা হয়, তখন অভিভাবক ও সন্তানের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাসের সম্পর্ককে আরও বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরাও। এমন এক প্রেক্ষাপটেই নিজের পিতৃত্বের অভিজ্ঞতা এবং সন্তানকে বড় করার দর্শন নিয়ে খোলামেলা কথা বললেন পরিচালক-অভিনেতা কৌশিক গাঙ্গুলি।
বাংলা চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম পরিচিত নাম কৌশিক গাঙ্গুলি। একাধিক প্রশংসিত ছবি পরিচালনার পাশাপাশি নিজের অভিনয় দিয়েও দর্শকদের মন জয় করেছেন তিনি। ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও বরাবরই স্পষ্টভাষী কৌশিক। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে ছেলে উজানের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক, পরিবারে গড়ে ওঠা বিশ্বাসের পরিবেশ এবং সন্তান প্রতিপালনের নিজস্ব পদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেন তিনি। সেই আলোচনায় উঠে আসে তাঁর নিজের বাবার সঙ্গে সম্পর্কের কথাও। কৌশিক জানান, তিনি বা তাঁর স্ত্রী চূর্ণী গাঙ্গুলি কেউই সন্তানের প্রতি অতিরিক্ত কঠোর নন। তবে তার মানে এই নয় যে উজানকে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বড় করা হয়েছে।
বরং ছোটবেলা থেকেই এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে, যেখানে শাসনের প্রয়োজন খুব কম পড়ে। তাঁর মতে, সন্তানকে এমনভাবে বড় করা দরকার যাতে সে নিজের দায়িত্ব নিজেই বুঝতে শেখে। কৌশিক বলেন, তাঁর নিজের বাবার সঙ্গে সম্পর্ক ছিল সম্মান ও দূরত্বের মিশেলে গড়ে ওঠা। বাবা ছিলেন অভিভাবক, আদর্শ এবং পথপ্রদর্শক। পরিচালকের কথায়, “আমার উপর বাবার আস্থা ছিল না, বাবা কোনদিনও আমার বন্ধু হতে পারেননি। উনি ছিলেন অর্ধেক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও অর্ধেক আবার অভিভাবক।” কিন্তু উজানের ক্ষেত্রে তিনি সেই প্রচলিত ধারণা থেকে কিছুটা আলাদা পথ বেছে নিয়েছেন।
আরও পড়ুন: “আপনার পছন্দের কারণেই তো সন্তান এই পৃথিবীতে আসে… জন্মদিনে ডাকলেও আসে না, নিজের সন্তানকে উপেক্ষা করে কেমন বাবা?” ভাইঝিকে নিয়ে পল্লবীর কণ্ঠে আক্ষেপ! সামনে এল তিক্ত স্মৃতি, সেখান থেকেই কি তৈরি হয়েছে বাবা প্রসেনজিৎ ও মেয়ে প্রেরণার সম্পর্কে দূরত্ব?
সাক্ষাৎকারে কৌশিক আরও বলেন, উজানের কাছে তিনি শুধুমাত্র বাবা নন, অনেকটাই বন্ধু। পরিচালকের কথায়, “উজানের ক্ষেত্রে আমি ৮৫ শতাংশ বন্ধু ও বাবা আর বাকিটুকু অভিভাবক”। তাঁর কথায়, পৃথিবীতে সত্যিকারের বন্ধুর অভাব এত বেশি যে ঘরের মধ্যেই যদি একজন নির্ভরযোগ্য বন্ধু পাওয়া যায়, তার মূল্য অপরিসীম। সেই কারণেই তিনি ছেলের সঙ্গে এমন সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন, যেখানে কোনও বিষয় গোপন রাখার প্রয়োজন পড়ে না। তিনি দাবি করেন, আজ এমন কোনও কথা নেই যা উজান তাঁর বা চূর্ণীর কাছে বলতে দ্বিধা করবে। সেই কথা তাঁদের ভালো লাগুক বা খারাপ লাগুক, উজান জানে যে সত্যি বললে তাকে শোনা হবে।
এই আস্থার জায়গাটাকেই তিনি বাবা-ছেলের সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেতু বলে মনে করেন। কৌশিকের মতে, পরিবারের মধ্যে সত্য বলার সংস্কৃতি তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। তাঁদের বাড়িতে একটি অলিখিত নিয়ম রয়েছে যে কোনও পরিস্থিতিতে সত্যিটা বলে দিতে হবে। ভুল হলে সেটাও স্বীকার করতে হবে। তিনি মনে করেন, সত্যি কথা বলার মধ্যেই রয়েছে আত্মমুক্তি এবং সম্পর্ককে সুস্থ রাখার শক্তি। কোনও ভুল বা অপরাধবোধ বুকের মধ্যে চেপে রাখার চেয়ে তা স্বীকার করে নেওয়া অনেক বেশি ইতিবাচক ফল দেয়। তাঁর ভাষায়, সত্য কখনও কখনও কঠিন হতে পারে, কিন্তু সেই সত্য থেকেই ক্ষমার জন্ম হয়। মিথ্যে কথা সাময়িকভাবে পরিস্থিতি সামাল দিলেও দীর্ঘমেয়াদে সম্পর্কের ভিত দুর্বল করে দেয়। আর তাই সন্তানের সঙ্গে বিশ্বাস, সততা এবং বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তোলাকেই তিনি একজন অভিভাবকের সবচেয়ে বড় সাফল্য বলে মনে করেন।






