টেলিভিশন এবং অভিনয় জগতের পরিচিত মুখ দেবরাজ মুখার্জি ও তাঁর স্ত্রী পাঞ্চালী মুখার্জি সম্প্রতি এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে নিজেদের ব্যক্তিগত জীবন, দাম্পত্য সম্পর্ক, বন্ধুত্ব, বর্তমান ইন্ডাস্ট্রির অবস্থা এবং সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন তারা। দীর্ঘদিনের বৈবাহিক জীবনেও কীভাবে বন্ধুত্ব, পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দিয়ে সম্পর্ককে সুন্দর রাখা যায়, সেই অভিজ্ঞতার পাশাপাশি বর্তমান বাংলা বিনোদন জগতে কাজের সংকট এবং ইনস্টাগ্রাম ফলোয়ার দেখে শিল্পী বাছাইয়ের প্রবণতা নিয়েও স্পষ্ট মতামত প্রকাশ করেছেন অভিনেতা। তাঁদের বক্তব্যে উঠে এসেছে সম্পর্কের বাস্তবতা, পেশাগত লড়াই এবং পরিবর্তিত সময়ের নানা দিক।
দেবরাজ ও পাঞ্চালীর পরিচয় শুধু বৈবাহিক দম্পতি হিসেবেই নয়, বরং দীর্ঘদিনের সঙ্গী ও বন্ধু হিসেবেও। প্রায় ১৫ বছরের দাম্পত্য জীবনের কথা বলতে গিয়ে দেবরাজ জানান, এখনও তিনি স্ত্রীকে শুধুমাত্র ‘স্ত্রী’ হিসেবে নয়, নিজের প্রেমিকা ও সবচেয়ে কাছের বন্ধু হিসেবেই দেখেন। তাঁদের সম্পর্কে অযথা নিয়ন্ত্রণ, সন্দেহ বা অতিরিক্ত খোঁজখবর নেওয়ার কোনও জায়গা নেই। দেবরাজের কথায়, “আমরা খুব কাছের বন্ধুর মতো থাকি। ও জানে আমার সামর্থ্য কতটা, তাই সেই অনুযায়ী আবদার করে।” অন্যদিকে পাঞ্চালীও জানান, তিনি নিজে বিজ্ঞাপনী সংস্থায় কাজ করতেন বলে শুটিং ও অভিনয় পেশার ব্যস্ততা খুব ভালোভাবেই বোঝেন। সেই কারণেই কখনও ‘খেয়েছ কি না’, ‘কোথায় আছ’ বা ‘কেন দেরি হচ্ছে’ ধরনের প্রশ্ন করে স্বামীকে বিরক্ত করেন না। তাঁদের মতে, বিশ্বাস এবং পরস্পরের ব্যক্তিগত পরিসরকে সম্মান করাই সম্পর্কের অন্যতম ভিত্তি।
সাক্ষাৎকারে বর্তমান সময়ে বিনোদন জগতের মানুষের মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে দেবরাজ বিষয়টিকে অত্যন্ত বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাখ্যা করেন। তাঁর মতে, কোনও পেশার সঙ্গে ডিভোর্সের সরাসরি সম্পর্ক নেই। মানুষ বিয়ে করে ভালো থাকার জন্য, কিন্তু যখন সেই ভালো থাকা আর সম্ভব হয় না, তখন অনেকেই আলাদা পথ বেছে নেন। যদিও নিজের সম্পর্কের প্রসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেন যে, তাঁদের মধ্যে বন্ধুত্ব এতটাই গভীর যে সেটাই দাম্পত্যকে শক্ত ভিত্তি দিয়েছে। পাশাপাশি দু’জনেই স্বীকার করেন, বর্তমান সময়ে বন্ধুত্ব এবং সামাজিক সম্পর্কের ধরন অনেক বদলে গেছে। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে মানুষ বাস্তবের তুলনায় ভার্চুয়াল জগতেই বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ছে, ফলে সম্পর্কের গভীরতা অনেক ক্ষেত্রেই কমে যাচ্ছে। দেবরাজের মতে, মানুষের মধ্যে মনুষ্যত্ব এবং আন্তরিকতার ঘাটতিও সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার অন্যতম কারণ।

এরপর আলোচনায় উঠে আসে অভিনয় জগতের বর্তমান পরিস্থিতি। দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে দেবরাজ বলেন, “কাজ না পাওয়ার অনেক কারণ থাকতে পারে। কেউ হয়তো অভিনয়ে দুর্বল, কেউ বেশি পারিশ্রমিক চান, কেউ সময় দিতে পারেননি। কিন্তু এটাও সত্যি যে এখন অনেক দক্ষ অভিনেতাও পর্যাপ্ত কাজ পাচ্ছেন না।” উদাহরণ হিসেবে তিনি প্রবীণ অভিনেতা শংকর চক্রবর্তী-র নাম উল্লেখ করে বলেন, এত শক্তিশালী অভিনেতার জন্যও আজকের ধারাবাহিকগুলিতে উপযুক্ত চরিত্র না থাকা অত্যন্ত হতাশাজনক। তাঁর মতে, একসময় শুধুমাত্র অভিনয় দক্ষতার ভিত্তিতেই শিল্পী নির্বাচন করা হতো। এখন সেই চিত্র অনেকটাই বদলে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগের বিষয়।
আরও পড়ুনঃ ভুগছেন নিরাপত্তাহীনতায়! এবার সুরক্ষার দাবিতে হাইকোর্টের দ্বারস্থ মিমি চক্রবর্তী! হঠাৎ কী এমন ঘটেছে অভিনেত্রীর সঙ্গে?
সবচেয়ে কড়া মন্তব্যটি তিনি করেন সোশ্যাল মিডিয়া নির্ভর কাস্টিং প্রসঙ্গে। দেবরাজের অভিযোগ, বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রেই শিল্পীর অভিনয় ক্ষমতার চেয়ে ইনস্টাগ্রাম ফলোয়ার সংখ্যাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তাঁর কথায়, “রিল বানিয়ে বা ফলোয়ার দেখে কাস্টিং করা হচ্ছে। এটা একদমই ভুল।” তিনি দাবি করেন, অভিনয় দক্ষতাকে উপেক্ষা করে শুধুমাত্র জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে শিল্পী নির্বাচন করার ফলেই অনেক ধারাবাহিক কয়েক মাসের মধ্যেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এবং দর্শকের মনে স্থায়ী ছাপ ফেলতে পারছে না। অতীতের জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘টাপুর টুপুর’-এর উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, আজও মানুষ সেই চরিত্রের নামেই তাঁকে মনে রাখে। তাঁর মতে, একটি সফল কাজের মূল শক্তি অভিনয় এবং শক্তিশালী গল্প, সোশ্যাল মিডিয়ার সংখ্যা নয়। তাই বাংলা বিনোদন জগতকে আবারও অভিনয়-কেন্দ্রিক মূল্যায়নের দিকে ফিরতে হবে বলেই মনে করেন অভিনেতা।






