টলিউডের বিশিষ্ট অভিনেতা ও নাট্যকর্মী ‘কৌশিক সেন’ (Kaushik Sen) দীর্ঘদিন ধরেই শুধু অভিনয়ের জন্য নয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়েও নিজের মতামতের জন্য আলোচনায় থাকেন। দুই দশকেরও বেশি সময় আগে বাম সরকারের নানান নীতির বিরুদ্ধে তিনি পথে নেমেছিলেন। পরে তৃণমূল সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপেরও প্রকাশ্যে সমালোচনা করেছেন। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদলের পরও তাঁর অবস্থানে খুব একটা পরিবর্তন আসেনি। বরং তিনি মনে করেন, কোনও রাজনৈতিক পরিবর্তনকে জাদুকাঠি ভেবে নেওয়া ঠিক নয়। সম্প্রতি নিজের নতুন নাটক ‘ম্যাকবেথ ২.০’ এবং বর্তমান রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বিস্তারিত কথা বলেন। সেই আলোচনায় উঠে আসে নাটক, ক্ষমতা, ফ্যাসিবাদ, টলিউডের সংকট এবং রাজনৈতিক আশাবাদ নিয়ে তাঁর স্পষ্ট অবস্থান।
নতুন নাটক ‘ম্যাকবেথ ২.০’ প্রসঙ্গে কৌশিক জানান, ‘ম্যাকবেথ’ তাঁর কাছে শুধুমাত্র একটি নাটক নয়, বরং একটি সামাজিক অসুখের প্রতীক। তিনি মনে করিয়ে দেন, ২০১২ সালেও তিনি ‘ম্যাকবেথ’ মঞ্চস্থ করেছিলেন। তখন রাজ্যে নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে এবং সমাজে দ্রুত রাজনৈতিক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছিল। সেই প্রযোজনায় দেখানো হয়েছিল, ম্যাকবেথের পতনের পর নতুন রাজা এলেও পুরনো ক্ষমতার সহযোগীরাই আবার ক্ষমতার কাছাকাছি জায়গায় থেকে যায়। তাঁর মতে, সেই সময় যেমন সিপিএমের ঘনিষ্ঠ বহু মানুষ নতুন রাজনৈতিক শিবিরে চলে গিয়েছিল, তেমন দৃশ্যই তাঁরা নাটকে তুলে ধরেছিলেন। তবে এবারের ‘ম্যাকবেথ ২.০’ শুধু বাংলার প্রেক্ষাপটে সীমাবদ্ধ নয়।
তাঁর মতে, গোটা দেশ এবং বিশ্বের বর্তমান পরিস্থিতিও এই নাটকের সঙ্গে সম্পর্কিত। নতুন প্রযোজনায় মূলত ম্যাকবেথ ও লেডি ম্যাকবেথকে কেন্দ্র করে গল্প এগিয়েছে। এই দুই চরিত্রে অভিনয় করছেন কৌশিক ও তাঁর স্ত্রী রেশমি সেন। সঙ্গে রয়েছে তিন ডাকিনী, কয়েকটি ছোট চরিত্র এবং কিছু শিশু শিল্পী। তিনি বলেন, পুরো ঘটনাই যেন দুই চরিত্রের মানসিক জগতের ভেতরে ঘটছে, কারণ ফ্যাসিবাদ প্রথমে মানুষের চিন্তাভাবনাকেই দখল করে। চারশো বছরের পুরনো শেক্সপিয়রের নাটক এখনও কতটা প্রাসঙ্গিক, সেই প্রশ্নের উত্তরে কৌশিক স্পষ্টভাবে জানান যে এই নাটকের প্রাসঙ্গিকতা আজও অটুট। তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা তিনি অনেক আগেই অনুভব করেছিলেন।
সেই কারণেই বিধানসভা নির্বাচনের অনেক আগে গত ডিসেম্বরেই নাটকটি মঞ্চস্থ করা হয়। তাঁর ব্যাখ্যায়, ‘হ্যামলেট’ এবং ‘ম্যাকবেথ’ আসলে দুই ভিন্ন ধরনের সংকটের গল্প। হ্যামলেট ভাবতে থাকে কী করবে, আর ম্যাকবেথ ভাবার আগেই কাজ করে ফেলে। বারবার অন্যদের পরামর্শে সে নিজের অপরাধকে যুক্তি দিয়ে ঢাকার চেষ্টা করে। কৌশিকের মতে, এখানেই বর্তমান সময়ের সঙ্গে নাটকের মিল রয়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, রাজনৈতিক পালাবদলের পর অনেকেই দাবি করছেন যে অতীতের নানা কাজ তাঁদের দিয়ে করিয়ে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি মনে করেন না যে সমস্ত দায় কয়েকজন ব্যক্তির উপর চাপিয়ে দিলেই সত্যিটা ধরা পড়বে।
তাঁর মতে, স্বরূপ বিশ্বাস বা ইন্দ্রনীল সেনের মতো মানুষ সমাজের নীরবতা ও প্রতিবাদের অভাব থেকেই শক্তি পায়। ফলে শুধু ব্যক্তিকে দোষ দিলেই সমস্যার সমাধান হয় না। বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের বর্তমান অবস্থা নিয়েও খোলাখুলি মত প্রকাশ করেন কৌশিক সেন। তাঁর মতে, বাংলা সিনেমার সমস্ত সমস্যার জন্য শুধুমাত্র রাজনৈতিক চাপকে দায়ী করা ঠিক নয়। তিনি মনে করেন, ইন্ডাস্ট্রির ভেতরেও বেশ কিছু ঘাটতি রয়েছে। গত এক দশকে কতগুলি বাংলা ছবি সত্যিকারের ব্যবসায়িক সাফল্য পেয়েছে, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, শুধুমাত্র সাফল্য উদযাপনের ছবি প্রকাশ করলেই বাস্তব পরিস্থিতি বদলে যায় না। বরং প্রয়োজন আত্মসমালোচনার।
তিনি মনে করেন, সিনেমার যে বিপুল শক্তি রয়েছে, বাংলা চলচ্চিত্র জগৎ তার পুরোটা ব্যবহার করতে পারছে না। এর পিছনে চর্চার অভাব, কাজের প্রতি পর্যাপ্ত গুরুত্ব না দেওয়া এবং উৎকর্ষের ঘাটতি রয়েছে। এই বাস্তবতা মেনে নিতে পারলেই বাংলা ছবির উন্নতির পথ খুলতে পারে বলে মনে করেন তিনি। রাজনৈতিক পালাবদলের পর শিল্পী ও নাট্যকর্মীরা আরও স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন কি না, সেই প্রশ্নের উত্তরেও কৌশিক খুব আশাবাদী নন। তাঁর মতে, ক্ষমতায় নতুন দল এলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। তিনি বলেন, বিদায়ী সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, কিন্তু নতুন শাসকদের ক্ষেত্রেও নানা অভিযোগ ইতিমধ্যেই সামনে এসেছে। তাই শুধুমাত্র দল বদল হলেই সমাজ বদলে যায় না।
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, একদিকে যেমন রাজ্যের শাসকদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে, তেমনই কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধেও পরিবেশ ও জনস্বার্থ বিরোধী সিদ্ধান্তের অভিযোগ রয়েছে। ফলে কোনও রাজনৈতিক শক্তিকেই সম্পূর্ণ নির্ভুল হিসেবে দেখা উচিত নয়। তাঁর মতে, তৃণমূল সরকারের বিদায় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলেও নতুন সরকার এলেই সব সমস্যার সমাধান হবে বলে বিশ্বাস করার কারণ নেই। দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং নিজের দীর্ঘদিনের প্রতিবাদী অবস্থান নিয়ে কথা বলতে গিয়ে কৌশিক জানান, তিনি নিজেকে আশাবাদী বলতে চান না।
আরও পড়ুনঃ ১৪ বছর বিনোদন জগত থেকে দূরে! একসময় পর্দা কাঁপানো বাঙালি নায়িকা, একের পর এক হিট ছবি, তারপর আচমকাই অভিনয়কে বিদায়! দুবাইয়ে আজ কোটি টাকার ব্যবসার মালকিন এই সুন্দরী, তবু কেন বিয়ে করলেন না এখনও?
বরং অকারণ আশাবাদের মধ্যেই তিনি বিপদ দেখেন। তাঁর মতে, অনেক সময় অতিরিক্ত আশাবাদ মানুষকে নিজের দায়িত্ব থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। ২০০৭ সাল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত বাম, তৃণমূল কিংবা বিজেপি, যে সরকারের বিরুদ্ধেই প্রয়োজন হয়েছে তিনি প্রতিবাদ করেছেন। সেই অবস্থান নিয়ে তাঁর কোনও অনুশোচনা নেই। তিনি মনে করেন, মতের সঙ্গে সবাই একমত নাও হতে পারেন, কিন্তু তিনি যা বলেছেন বা করেছেন, তার সম্পূর্ণ দায় নিজের কাঁধেই নিয়েছেন। আজও সেই অবস্থান থেকে তিনি এক চুলও সরেননি। রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের চেয়ে মানুষের ভিতরের ‘ম্যাকবেথ’কে চেনাটাই তাঁর কাছে অনেক বেশি জরুরি বলে মনে করেন কৌশিক সেন।






