“মেয়ের জন্যই বেঁচে আছি, দু’হাতে মোট ১৮টি সেলাই…দেড় বছর ধরে ডিপ্রে’শনে ভুগছি” “না বুঝেছি সংসার, পেশার রাজনীতিও বুঝিনি” চোখের নীচে কালি, মনে জমেছে দুঃখের পাহাড়! সন্তানকে আঁকড়ে থাকা থেকে কাজ না পাওয়া, নিজের বর্তমান অবস্থার কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লেন স্বর্ণকমল দত্ত!

বাংলা টেলিভিশন এবং বড়পর্দার পরিচিত মুখ ‘স্বর্ণকমল দত্ত’ (Swarnakamal Dutta) দীর্ঘ অভিনয় জীবনে বহু জনপ্রিয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন। সম্প্রতি তাঁকে দেখা গিয়েছে ‘শুধু তোমারই জন্য’, ‘চিরসখা’ এবং ‘ভোলে বাবা পার কারেগা’র মতো ধারাবাহিকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায়। কিন্তু পর্দায় হাসিমুখে ধরা দিলেও বাস্তবে তিনি যে দীর্ঘদিন ধরে এক কঠিন মানসিক লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন, তা সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে খোলাখুলি জানিয়েছেন। অভিনেত্রীর কথায়, গত দেড় বছর ধরে তিনি গভীর অবসাদের সঙ্গে লড়ছেন। ব্যক্তিগত জীবনের টানাপড়েন যেমন তার একটি কারণ, তেমনই পেশাগত অনিশ্চয়তাও তাঁকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করেছে। কিছুদিন আগে দুর্ঘ’টনায় হাতে চোট পাওয়ার ঘটনাও তাঁর জীবনের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল বলেও জানিয়েছেন।

প্রসঙ্গত, স্বর্ণকমলের ব্যক্তিগত জীবন আগেও বহুবার আলোচনায় এসেছে। দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনে নানান সমস্যার মুখোমুখি হওয়ার কথা তিনি নিজেই প্রকাশ্যে বলেছেন। সম্পর্কের ভাঙন, মানসিক অশান্তি এবং একা হাতে মেয়েকে মানুষ করার দায়িত্ব আজও তাঁর জীবনের বড় বাস্তবতা। অভিনেত্রী জানিয়েছেন, সব কষ্টের কথা তিনি কারও সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারেন না। বৃদ্ধ মা-বাবার উপর বাড়তি চাপ দিতে চান না, আবার মেয়ের কাছেও সব সত্যি খুলে বলতে দ্বিধা হয়। তাঁর কথায়, একাকীত্ব এমন এক অনুভূতি যা ধীরে ধীরে মানুষকে ভিতর থেকে গ্রাস করে ফেলে। সেই নিঃসঙ্গতার সঙ্গেই প্রতিদিন লড়াই করতে হচ্ছে তাঁকে।

তবে শুধু ব্যক্তিগত কারণ নয়, পেশাগত হতাশাকেই তিনি তাঁর মানসিক অবসাদের প্রধান কারণ বলে মনে করছেন। স্বর্ণকমলের দাবি, বহুবার এমন হয়েছে যখন কোনও ধারাবাহিক বা চরিত্র নিয়ে তাঁর সঙ্গে চূড়ান্ত পর্যায় পর্যন্ত আলোচনা এগিয়েছে। পারিশ্রমিক নির্ধারণ হয়েছে, শুটিংয়ের সম্ভাব্য তারিখও ঠিক হয়েছে, কিন্তু শেষ মুহূর্তে কাজটি আর তাঁর হাতে আসেনি। কেন এমন হচ্ছে, তার কোনও স্পষ্ট উত্তরও তিনি পাননি। ফলে একের পর এক সুযোগ হাতছাড়া হতে হতে তাঁর আত্মবিশ্বাসেও ধাক্কা লেগেছে। অভিনেত্রীর কথায়, অনেক ভালো চরিত্র সামনে এসেও শেষ পর্যন্ত অন্য কারও কাছে চলে গিয়েছে।

অভিনয়ের প্রতি তাঁর ভালোবাসা আজও অটুট। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ভালোবাসার সংজ্ঞা বদলেছে বলেও জানিয়েছেন তিনি। একসময় শুধুমাত্র অভিনয়ের টানেই কাজ করতেন, এখন তার সঙ্গে জুড়ে গেছে বাস্তব জীবনের প্রয়োজন। সংসার চালানো, মেয়ের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা এবং নিজের দায়িত্ব পালন করার জন্য নিয়মিত কাজ পাওয়া তাঁর কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই কারণেই কাজের অভাব তাঁকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, এখন আর নিজের পছন্দ-অপছন্দ দেখার সুযোগ নেই, বরং কাজ পাওয়াটাই সবচেয়ে বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ছোটপর্দায় তাঁর যাত্রা শুরু হয়েছিল অভিজ্ঞ নির্মাতাদের হাত ধরে। সেই সময় শিল্পীদের কাজ এবং দক্ষতাকে যেভাবে মূল্য দেওয়া হতো, এখন সেই পরিবেশ অনেকটাই বদলে গিয়েছে বলে মনে করেন অভিনেত্রী। তাঁর মতে, গত কয়েক বছরে বিনোদন জগতের মূল্যায়নের ধরন পরিবর্তিত হয়েছে। অভিনয় দক্ষতার পাশাপাশি এখন সামাজিক মাধ্যমে উপস্থিতি, অনুসরণকারীর সংখ্যা বা বিভিন্ন ডিজিটাল জনপ্রিয়তাও গুরুত্ব পাচ্ছে। স্বর্ণকমল অকপটে স্বীকার করেছেন, তিনি এই প্রতিযোগিতায় খুব একটা স্বচ্ছন্দ নন। সামাজিক মাধ্যমে নিয়মিত সক্রিয় থাকাও তাঁর অভ্যাস নয়। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই নিজেকে পিছিয়ে পড়া মনে হয় তাঁর।

আরও পড়ুন: “আমি পা’পটা করতে চাইনি, তুমি ও তোমরা আমাকে দিয়ে করিয়ে নিয়েছ!” সব দো’ষ স্বরূপদের ঘাড়ে চাপালেই হবে? পালাবদলের পরও ‘ভয় আউট ভরসা ইন’ নিয়ে আশাবাদী নন কৌশিক সেন! রাজ্য থেকে টলিউডের ভবিষ্যৎ নিয়ে কী কড়া বার্তা তাঁর?

সাক্ষাৎকারে রাজনীতি নিয়েও প্রশ্ন করা হলে অভিনেত্রী স্পষ্ট ভাষায় জানান, তিনি কোনওদিনই রাজনীতির মানুষ নন। তাঁর কথায়, সংসারের ভেতরের জটিলতা কিংবা পেশাগত সম্পর্কের নানান সমীকরণই তিনি ঠিকমতো বুঝে উঠতে পারেননি, সেখানে বৃহত্তর রাজনীতি বোঝা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। তিনি মজা করেই বলেন, যদি সংসারের রাজনীতি আর পেশার রাজনীতি বুঝতে পারতেন, তাহলে হয়তো আজ এতটা মানসিক চাপে ভুগতে হতো না। তাঁর এই মন্তব্যও বর্তমানে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। কারণ এর মধ্যেই যেন লুকিয়ে রয়েছে তাঁর দীর্ঘদিনের হতাশা এবং অভিজ্ঞতার প্রতিফলন।

ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলতে গিয়েও আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন অভিনেত্রী। নতুন করে কোনও সম্পর্কের সম্ভাবনা আছে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, এই মুহূর্তে তাঁর জীবনের কেন্দ্রবিন্দু শুধুমাত্র তাঁর মেয়ে। যদিও মেয়ে চায় মা নিজের মতো করে জীবন কাটাক, তবুও স্বর্ণকমলের মনে হয়, নতুন কোনও সম্পর্ক এলে সেই পরিবর্তন মেয়ে সহজে মেনে নিতে পারবে না। তাই আপাতত নিজের ব্যক্তিগত জীবন নয়, মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়েই বেশি ভাবছেন তিনি। তবে জীবনের অনিশ্চয়তার কথা স্বীকার করে অভিনেত্রী এটাও বলেন, ভবিষ্যতে কী অপেক্ষা করছে তা কেউ জানে না। কিন্তু বর্তমানে তাঁর সবচেয়ে বড় চাওয়া একটাই, নিয়মিত কাজ এবং অভিনয় করার সুযোগ।

You cannot copy content of this page