“মাকে ভেন্টিলেশনে রেখে শো করতে গেছি, ফিরে শুনলাম মা আর নেই” সেদিন অজান্তেই মঞ্চে গেয়েছিলেন ‘ও তোতা পাখি রে…’ অভিনয়ের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে জীবনের সবচেয়ে বড় আক্ষেপ বয়ে বেড়াচ্ছেন জয়ন্ত দত্ত! মায়ের শেষ মুহূর্তে কোন আশা পূরণ না করতে পারার য’ন্ত্রণা আজও তাড়া করে ফেরে অভিনেতাকে?

মঞ্চের আলো, ক্যামেরার ঝলকানি আর দর্শকদের হাততালির আড়ালে লুকিয়ে থাকে শিল্পীদের ব্যক্তিগত জীবনের অসংখ্য না-বলা গল্প। পর্দায় যাঁদের সবসময় হাসিমুখে দেখা যায়, তাঁদের অনেককেই জীবনের কঠিনতম সময়েও পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে হয়। কখনও প্রিয়জনের অসুস্থতা, কখনও ব্যক্তিগত শোক, কখনও বা গভীর মানসিক যন্ত্রণাকে আড়াল করেই মঞ্চে উঠতে হয় একজন শিল্পীকে। সম্প্রতি এমনই এক হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরলেন অভিনেতা জয়ন্ত দত্ত, যা শুনে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছেন তাঁর অনুরাগীরাও।

বাংলা টেলিভিশনের দর্শকদের কাছে জয়ন্ত দত্ত অত্যন্ত পরিচিত নাম। ‘জননী’ ধারাবাহিকের রাজু চরিত্র দিয়ে বিপুল জনপ্রিয়তা পাওয়ার পর নায়ক, খলনায়ক এবং চরিত্রাভিনেতা হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে চলেছেন তিনি। অভিনয়ের পাশাপাশি যাত্রা, থিয়েটার এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও যুক্ত রয়েছেন। বহু উত্থান-পতনের সাক্ষী এই অভিনেতা সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে জীবনের এমন একটি অধ্যায়ের কথা স্মরণ করেন, যা আজও তাঁর মনে গভীর ক্ষত হয়ে রয়ে গেছে।

সাক্ষাৎকারে জয়ন্ত দত্ত জানান, তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন দিনগুলোর একটি ছিল মায়ের মৃত্যুর দিন। সেই সময় মা গুরুতর অসুস্থ ছিলেন এবং হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। পরিস্থিতি এতটাই সংকটজনক হয়ে উঠেছিল যে তাঁকে ভেন্টিলেশনে রাখতে হয়। কিন্তু ঠিক সেই সময়ই অভিনেতার আগে থেকে নির্ধারিত একটি শো ছিল। শিল্পী হিসেবে দায়িত্ব এবং মায়ের পাশে থাকার আকাঙ্ক্ষার মধ্যে ভয়ংকর এক টানাপোড়েনের মুখে পড়েছিলেন তিনি। তবুও পেশাগত দায়িত্বের কথা ভেবে শো করতে যেতে হয়েছিল তাঁকে। জয়ন্তর কথায়, “শো করতে গিয়ে প্রথম শোটা হলো। দ্বিতীয় শোর দিন খবর এলো মা নেই, মা চলে গেছে।” এই কয়েকটি শব্দ উচ্চারণ করতে গিয়েও স্পষ্টতই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন অভিনেতা।

তিনি জানান, সেই মুহূর্তটা এখনও তাঁর কাছে অবিশ্বাস্য মনে হয়। মাকে হাসপাতালে রেখে মঞ্চে দাঁড়িয়ে অভিনয় করা এবং তারপর হঠাৎ তাঁর মৃত্যুসংবাদ পাওয়া এই অভিজ্ঞতা কোনওদিন ভুলতে পারেননি তিনি। একজন ছেলে হিসেবে সেই সময় মায়ের পাশে থাকতে না পারার আক্ষেপ আজও তাঁকে তাড়া করে বেড়ায়। যদিও একজন পেশাদার শিল্পী হিসেবে নিজের দায়িত্ব পালন করেছিলেন, তবুও মায়ের শেষ সময়ে তাঁর কাছে না থাকতে পারার কষ্ট তিনি এখনও বয়ে বেড়ান। অভিনেতার মতে, জীবনে অনেক সাফল্য, জনপ্রিয়তা এবং দর্শকদের ভালোবাসা পেলেও কিছু শূন্যতা কখনও পূরণ হয় না, আর তাঁর মায়ের চলে যাওয়ার স্মৃতি তেমনই এক অপূরণীয় ক্ষতি।

আরও পড়ুনঃ “তখন আমার বয়স মাত্র এক বছর…” “মা কাঁদত আর আমি দেখতাম, এবার মা শুধুই হাসুক আমি চাই!” কোলের শিশু ও স্ত্রীকে রেখে চলে যান স্বামী! একলা মায়ের সংগ্রামের নীরব সাক্ষী মেয়ে, শেষ করে দিতে চেয়েছিল নিজেকে! জীবনের অন্ধকার অধ্যায় প্রকাশ্যে আনলেন অভিনেত্রী মেঘনা হালদার, মেঘনা-অক্ষরার লড়াই ছুঁয়ে যাবে হৃদয়!

জয়ন্ত দত্তর এই অভিজ্ঞতা আবারও মনে করিয়ে দেয় যে পর্দার পরিচিত মুখগুলিও শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের মতোই আবেগ, ভালোবাসা এবং শোকের মধ্য দিয়েই জীবন কাটান। দর্শকরা তাঁদের অভিনয়, জনপ্রিয়তা বা সাফল্য দেখেন, কিন্তু সেই সাফল্যের পেছনে কত ত্যাগ, কত ব্যক্তিগত কষ্ট লুকিয়ে থাকে, তা অনেক সময় অজানাই থেকে যায়। মায়ের শেষ সময়ে পাশে থাকতে না পারার যন্ত্রণা আজও জয়ন্ত দত্তর কণ্ঠে স্পষ্ট। আর সেই কারণেই তাঁর এই স্মৃতিচারণ শুধু একজন অভিনেতার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নয়, বরং প্রতিটি সন্তানের হৃদয়ে স্পর্শ করার মতো এক গভীর মানবিক গল্প।

You cannot copy content of this page