“সেদিন যদি আমি ওঁর পা জড়িয়ে না ধরতাম, বড় বি’পদ হয়ে যেত!” বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়কে থামাতে ‘নাকের জলে চোখের জলে’ হতে হয়েছিল প্রসেনজিতকে! কোন ছবির শুটিং ফ্লোরে এমন কী ঘটেছিল, যার জন্য বর্ষীয়ান অভিনেতার সামনে অসহায় হয়ে পড়েছিলেন ‘জ্যেষ্ঠপুত্র’? বহু বছর পর সামনে এল অজানা গল্প!

বাংলা চলচ্চিত্র জগতের দুই পরিচিত মুখ প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় এবং বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়। বড়পর্দায় বহুবার তাঁদের মুখোমুখি সংঘর্ষ দর্শকদের বিনোদন দিয়েছে। একদিকে নায়ক, অন্যদিকে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের চরিত্রে তাঁদের রসায়ন দীর্ঘদিন ধরে জনপ্রিয়। তবে পর্দার বাইরে তাঁদের সম্পর্ক যে শুধুই সহকর্মীর নয়, বরং অনেক বেশি আন্তরিক এবং পারিবারিক, তার প্রমাণ মিলল সম্প্রতি। বহুদিন পর সমস্ত ব্যস্ততা সরিয়ে বিপ্লব চট্টোপাধ্যায় এবং তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে যান প্রসেনজিৎ। সেই সাক্ষাতের কিছু মুহূর্ত নিজের সমাজমাধ্যমে ভাগ করে নিয়ে তিনি লেখেন, “অনেকদিন পর বিপ্লব দা ও বৌদির সাথে আড্ডা দিলাম…মন ভালো হয়ে গেলো।”

এরপর থেকেই অনুরাগীদের মধ্যে শুরু হয় নতুন আলোচনা। ভিডিওতে দেখা যায়, কোনও আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই একেবারে ঘরোয়া পরিবেশে গল্পে মেতে উঠেছেন তাঁরা। চা, আড্ডা আর পুরনো স্মৃতির ভাঁড়ার খুলে বসেছিলেন দুই অভিনেতা। সেই আড্ডার মাঝেই উঠে আসে বহু বছর আগের এক শ্যুটিং সেটের ঘটনা। প্রসেনজিৎ জানান, একসময় কোনও একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভীষণ রেগে গিয়েছিলেন বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছিল যে উপস্থিত অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন। তখন বড় কোনও বিপদ এড়াতে তাঁকেই এগিয়ে আসতে হয়েছিল বলে জানান অভিনেতা।

সেই ঘটনার কথা বলতে গিয়ে প্রসেনজিৎ হাসতে হাসতেই বলেন, “আমি সেদিন বিপ্লবদার দু’পা জড়িয়ে ধরে হাউহাউ করে কাঁদছি! ওঁর পা ছাড়ছি না, ওঁর ওপর উঠতে দিচ্ছি না। কারণ আমি খুব ভাল করেই জানি, একবার যদি বিপ্লবদা সেদিন উঠে দাঁড়াত, তবে ওই লোকটা পুরো শেষ হয়ে যেত! ওখান থেকে কোনঅভাবে ওকে বের করে দিয়েছিলাম আমি।” অভিনেতার এই মন্তব্য শুনে পাশেই বসে থাকা বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়কে মৃদু হাসিতে সম্মতি জানাতে দেখা যায়। তাঁদের সেই স্মৃতিচারণে স্পষ্ট হয়ে ওঠে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার সম্পর্ক।

আরও পড়ুন: “মাকে ভেন্টিলেশনে রেখে শো করতে গেছি, ফিরে শুনলাম মা আর নেই” সেদিন অজান্তেই মঞ্চে গিয়েছিলেন ‘ও তোতা পাখি রে…’ অভিনয়ের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে জীবনের সবচেয়ে বড় আক্ষেপ বয়ে বেড়াচ্ছেন জয়ন্ত দত্ত! মায়ের শেষ মুহূর্তে কোন আশা পূরণ না করতে পারার য’ন্ত্রণা আজও তাড়া করে ফেরে অভিনেতাকে?

আড্ডার এক পর্যায়ে প্রসেনজিৎ নিজের ছোটবেলার একটি বিশেষ স্মৃতিও ভাগ করে নেন। তিনি জানান, শিশু বয়সে মঞ্চে অভিনয় করার সুযোগ হয়েছিল তাঁর। ‘চারমূর্তি’র গল্প অবলম্বনে তৈরি ‘টেনিদা’ নাটকে অভিনয় করেছিলেন তিনি। সেই অনুষ্ঠানে দর্শকাসনে উপস্থিত ছিলেন কিংবদন্তি চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায়। শুধু তাই নয়, সেই অভিনয় প্রত্যক্ষ করেছিলেন বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়ও। বহু বছর পর সেই দিনের কথা মনে করে দু’জনেই নস্টালজিয়ায় ভেসে যান। পুরনো দিনের সেই স্মৃতি আড্ডাকে আরও আবেগঘন করে তোলে।

শুধু অতীতের গল্পই নয়, বর্তমান প্রসেনজিৎকেও প্রশংসায় ভরিয়ে দেন বিপ্লব চট্টোপাধ্যায় এবং তাঁর স্ত্রী। দীর্ঘদিনের পরিচিত বুম্বাদার ফিটনেস, কর্মক্ষমতা এবং ব্যক্তিত্বের প্রশংসা করতে শোনা যায় তাঁদের। স্নেহভরা গলায় বিপ্লববাবুর স্ত্রী বলেন, “বুম্বা, কী মিষ্টি লাগছে তোকে!” এই মন্তব্যের পর আড্ডার পরিবেশ আরও উষ্ণ হয়ে ওঠে। বহু বছরের পরিচিত সম্পর্কের মধ্যে যে এখনও একই রকম ভালোবাসা এবং টান রয়ে গেছে, সেটাই যেন ফুটে ওঠে সেই মুহূর্তে। সবচেয়ে আবেগঘন দৃশ্যটি দেখা যায় বিদায়ের সময়।

বাড়ি থেকে বেরোনোর আগে প্রসেনজিতের হাত নিজের হাতে নিয়ে তাতে স্নেহভরা চুম্বন দেন বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়ের স্ত্রী। এরপর আবেগপূর্ণ কণ্ঠে বলেন, “সুস্থ থাকবি আর মনে রাখবি আমাদের। আমাদের আর কিচ্ছু চাই না!” পরিবারের সদস্যের মতো এই ভালোবাসা পেয়ে আবেগাপ্লুত হন প্রসেনজিৎও। দুই প্রজন্মের শিল্পীর এই আন্তরিক পুনর্মিলনের ভিডিও দেখে অনুরাগীরাও মুগ্ধ। অনেকেই মনে করছেন, খ্যাতি আর সাফল্যের বাইরেও সম্পর্কের এই উষ্ণতাই আসল সম্পদ।

You cannot copy content of this page