বাংলা চলচ্চিত্রের বর্ষীয়ান অভিনেত্রী ‘মমতা শঙ্কর’ (Mamata Shankar) বরাবরই নিজের স্পষ্ট বক্তব্যের জন্য পরিচিত। বিভিন্ন সামাজিক বিষয় থেকে শুরু করে সিনেমার ভাষা, অভিনয়ের ধরণ কিংবা শিল্পচর্চা নিয়ে নিজের মতামত অকপটে তুলে ধরতে কখনও পিছপা হন না তিনি। সেই কারণেই একাধিকবার তাঁর মন্তব্য ঘিরে আলোচনা যেমন হয়েছে, তেমনই বিতর্কও তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে নিজের প্রথম ছবি ‘মৃগয়া’-র শুটিংয়ের একটি অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে গিয়ে আবারও এমন কিছু কথা বললেন, যা অনেকের কাছেই চমকে দেওয়ার মতো মনে হতে পারে। তবে অভিনেত্রীর বক্তব্যে উঠে এসেছে সেই সময়ের চলচ্চিত্র নির্মাণের বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং একজন পরিচালকের শিল্পভাবনা।
মমতা শঙ্কর জানান, ‘মৃগয়া’ ছিল তাঁর প্রথম ছবি। অভিনয় সম্পর্কে তখন তাঁর কোনও বাস্তব অভিজ্ঞতা ছিল না। তিনি বলেন, এখনকার সময়ে গ্রামের মেয়ের চরিত্রে অভিনয় করলেও শাড়ির ভিতরে অন্তর্বাস থাকে, নিরাপত্তার জন্য সেফটিপিন দিয়ে শাড়ি সুন্দরভাবে পরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু ‘মৃগয়া’-র সময় পরিচালক মৃণাল সেন বাস্তব গ্রামবাংলার চেহারাটাই পর্দায় তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। তাই গোটা ছবির শুটিংয়ে তাঁর শরীরে শুধু উপরে ও নিচে দু’টুকরো কাপড় থাকত। ভিতরে কোনও অন্তর্বাস ছিল না, এমনকি শাড়িও সেফটিপিন দিয়ে আটকানো থাকত না। প্রথম ছবি হওয়ায় সবকিছু নিয়েই তিনি স্বাভাবিকভাবেই অস্বস্তিতে ছিলেন, তবু পরিচালকের নির্দেশ মেনেই কাজ চালিয়ে গিয়েছিলেন।
এরই মধ্যে একদিন মৃণাল সেন তাঁকে জানান, ছবিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্য রয়েছে যেখানে জমিদারের হাতে তাঁর চরিত্র শ্লীলতাহানির শিকার হবে। এই কথা শোনার পর থেকেই আতঙ্কে দিন কাটতে থাকে অভিনেত্রীর। তাঁর কথায়, প্রতিদিন শুটিংয়ে যাওয়ার সময় মনে হতো, হয়তো সেদিনই সেই দৃশ্যের কাজ হবে। অবশেষে যেদিন তাঁকে জানানো হয় সেই দৃশ্যের শুটিং হবে, আগের রাত থেকে তিনি ঠিকমতো ঘুমোতে পারেননি, খেতেও পারেননি। পরদিন সেটে গিয়ে তাঁকে শুধু কিছু কাঠ এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরাতে বলা হয় এবং তারপর এমনভাবে প্রতিক্রিয়া দিতে বলা হয় যেন তিনি ভয়ঙ্কর কিছু দেখে ফেলেছেন। সেই অনুযায়ী অভিনয় করার পরও তাঁর গলা শুকিয়ে যাচ্ছিল, কারণ তিনি অপেক্ষা করছিলেন পরের অংশের জন্য।
কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই মৃণাল সেন ‘প্যাক আপ’ বলে দেন। অবাক হয়ে মমতা শঙ্কর জানতে চান, শ্লী’লতাহানির দৃশ্যটির শুটিং তো এখনও শুরুই হল না। তখন পরিচালক তাঁকে জানান, দৃশ্যটি ইতিমধ্যেই ধারণ করা হয়ে গেছে। পরে সিনেমা মুক্তির পর বড় পর্দায় সেই অংশ দেখে অভিনেত্রী নিজেই বিস্মিত হয়ে যান। তিনি জানান, শুটিংয়ের সময় করা তাঁর অভিনয় এবং পরে ডাবিংয়ের সময় মুখ চেপে রেকর্ড করা কিছু শব্দ মিলিয়েই পরিচালক এমনভাবে দৃশ্যটি তৈরি করেছিলেন, যেখানে কোনও অশালীন দৃশ্য না দেখিয়েও দর্শক পুরো ঘটনাটি অনুভব করতে পেরেছিলেন। তাঁর মতে, এটাই ছিল একজন নির্মাতার শিল্পবোধ এবং গল্প বলার দক্ষতার প্রকৃত উদাহরণ।
আরও পড়ুনঃ নতুন রাহুল সায়নকে মানতে নারাজ দর্শকরা, দিলেন ধারাবাহিক বয়কটের ডাক! চাপের মুখে ফের রাহুলের ভূমিকায় ফিরছেন শুভ্রজিৎ? অভিনেতা দিলেন কোন ইঙ্গিত?
এই প্রসঙ্গ টেনেই বর্তমান সময়ের সিনেমা ও ধারাবাহিকের দৃশ্যায়ন নিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করেন মমতা শঙ্কর। তাঁর কথায়, “এখন আমরা সবকিছু চামচ দিয়ে গিলিয়ে দিই। সবকিছু দেখানোর দরকার পড়ে না, মধ্যে সেই ব্যাপারটা আছে বোঝানোর তারা ঠিক পারে। আজকাল রক্ত, মারপিট আবার শুধু মারলে হবে না! কে কতটা খুঁচিয়ে মারতে পারে, আমাদের সবকিছু দেখার খিদেটা বেড়ে গেছে। সারল্য জিনিসটাই হারিয়ে গেছে, অথচ আমরা নাকি আরও উন্নত হচ্ছি! কোথায় উন্নতি হচ্ছে? আমার মনে হচ্ছে আমরা আরও পিছিয়ে যাচ্ছি! অদ্ভুত একটা সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি সত্যি কথা!” অভিনেত্রীর বক্তব্য চলচ্চিত্রের বদলে যাওয়া ভাষা ও দর্শকের রুচির পরিবর্তনের প্রতিফলন, আবার বর্তমান সময়ের বিনোদন মাধ্যমকে নিয়েও এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।






