বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এমন কিছু ছবি রয়েছে, যেগুলি শুধু বাণিজ্যিক সাফল্যই পায়নি, একটি সময়ে পুরো ইন্ডাস্ট্রিকেই নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি দিয়েছিল। সেই তালিকায় অন্যতম নাম ‘সাথী’। ২০০২ সালে হরনাথ চক্রবর্তীর পরিচালনায় মুক্তি পাওয়া এই ছবিতে জিৎ ও প্রিয়াঙ্কার জুটি দর্শকদের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নেয়। ছবির গান থেকে শুরু করে প্রেমের গল্প, সবকিছুই হয়ে ওঠে তুমুল জনপ্রিয়। দেখতে দেখতে ছবিটির ২৪ বছর পূর্ণ হয়েছে, আর আগামী বছর রজত জয়ন্তীর পথে এগোবে এই কাল্ট হিট সিনেমা। এত বছর পরেও ছবিটি নিয়ে মানুষের উচ্ছ্বাস দেখে আজও আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা উপেন্দ্র।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে প্রিয়াঙ্কা জানান, ‘সাথী’ তাঁর অভিনয় জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তিগুলির একটি। তিনি বলেন, “এটা হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া একটা মুহূর্ত আমার কাছে। ভীষণ আনন্দ দেয়। এমন একটা কাল্ট হিট কতজনই বা পায়?” শুধু ছবিই নয়, জিৎের সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক আজও একইরকম আন্তরিক। অভিনেত্রীর কথায়, “জিৎ যখনই বেঙ্গালুরুতে আসে, আমাদের সঙ্গে দেখা করে। আমিও কলকাতায় এলে জিৎ আর মোহনার সঙ্গে দেখা করবই। রবিবার বিকেলেও দেখা করে এসেছি।” এখন তাঁদের সম্পর্ক শুধুমাত্র সহঅভিনেতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, দুই পরিবারের মধ্যেও গভীর বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে।
তবে এত বড় সাফল্যের পরেও কেন তাঁকে দীর্ঘদিন বাংলা ছবিতে দেখা যায়নি, সেই প্রশ্ন বহুদিন ধরেই দর্শকদের মনে রয়েছে। এই প্রসঙ্গে প্রিয়াঙ্কা স্পষ্ট জানান, এর পিছনে কোনও ইন্ডাস্ট্রির রাজনীতি ছিল না। তিনি বলেন, “আমার খুব প্রিয় এই ইন্ডাস্ট্রি। কাজও করতে চাই ভীষণ ভাবে। বাংলা সিনেমা দেখতেও খুব ভালোবাসি।” তাঁর কথায়, ‘সাথী’-র পর মুম্বই থেকে একাধিক হিন্দি ছবির প্রস্তাব আসে। পরে বিয়ের পর স্বামী ও ছোট দুই সন্তানকে নিয়ে বেঙ্গালুরুতে চলে যান তিনি। সেই সময় একটানা এক বা দুই মাস কলকাতায় থেকে শুটিং করা সম্ভব ছিল না। সন্তানদের স্কুল ও পরিবারকে প্রাধান্য দিতেই বাংলা ছবি থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে হয়েছিল তাঁকে।
অভিনেত্রী আরও জানান, সন্তানরা বড় হওয়ার পরে আবার কিছু বাংলা ছবিতে অভিনয় করেছিলেন। পাশাপাশি দক্ষিণী ছবিতেও নিয়মিত কাজ শুরু করেন এবং এখনও সেই কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। সম্প্রতি ‘সেপ্টেম্বর ২১’ ছবির সূত্রে তিনি ‘কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল’-এও অংশ নিয়েছেন। তবে বাংলায় ফের কাজ করার ইচ্ছা এখনও আগের মতোই রয়েছে। তাঁর কথায়, “ভালো কিছু পেলে নিশ্চয়ই করব। এখানকার অডিয়েন্স এতটাই ভালোবাসা দেয়, এখন তো ছেলেমেয়েরাও বড় হয়ে গিয়েছে। তাই মুখিয়ে রয়েছি ভালো কিছুর জন্য। আসলে ‘সাথী’ এমন একটা বেঞ্চমার্ক তৈরি করেছে, তাই ওরকম কিছু করতে না পারলে মানুষ কতটা গ্রহণ করবে সেটা নিয়েও ভাবি। অনেকেই আমাদের কাছে ‘সাথী ২’ দেখার জন্য আবদার করছে। জানি না কবে সেটা হবে।”
টলিউডে কাজের সময় কোনও খারাপ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলেন কি না, সেই প্রশ্নেরও উত্তর দেন প্রিয়াঙ্কা। তিনি বলেন, “বাংলায় আমার ছবির সংখ্যা এতটাই কম, তাই সমস্যায় পড়া তো দূরের কথা, উল্টে খুব আদরে বড় হয়েছি। ছোট থেকে সবাই আমায় দেখেছে। সবাই নিজের বাড়ির মেয়ের মতো করে আগলে রেখেছিল। একটা পরিবারের মতো হওয়ায় কখনও অসুবিধা হয়নি।” তবে মাঝেমধ্যে তাঁর খারাপ লাগে এই ভেবে যে, যদি বাংলাতেই নিয়মিত থাকতে পারতেন, তাহলে হয়তো আরও নানা ধরনের চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পেতেন। একইসঙ্গে তিনি জানান, বাংলা সিনেমায় বিবাহিত বা অবিবাহিত শিল্পীদের আলাদা চোখে দেখা হয় না, বরং ভালো গল্প ও শক্তিশালী চরিত্রের গুরুত্বই বেশি। দক্ষিণী ইন্ডাস্ট্রিতেও বাংলা সিনেমার শিল্পীদের যথেষ্ট সম্মান দেওয়া হয় বলেও জানান তিনি।
আরও পড়ুনঃ “একটা টাকাও আমার নিজের কাছে রাখার অধিকার ছিল না…”, চার পুরুষের ডাক্তার পরিবারে বড় হয়েও কেন এমন কঠোর নিয়মে কাটল অর্জুন চক্রবর্তীর শৈশব? অভিনেতা নিজেই জানালেন জীবনের অজানা অধ্যায়!
আলোচনার শেষদিকে নিজের বেড়ে ওঠার কথাও ভাগ করে নেন অভিনেত্রী। কলকাতাতেই তাঁর জন্ম এবং ছোটবেলার বেশ কিছুটা সময়ও কেটেছে এই শহরে। পরে পড়াশোনার সূত্রে আমেরিকায় চলে যান, কিছুদিন সিঙ্গাপুরেও ছিলেন। এরপর আবার কলকাতায় ফিরে ‘ক্যালকাটা ইন্টারন্যাশনাল স্কুল’-এ পড়াশোনা করেন এবং সেই সময়ই ‘মিস ক্যালকাটা’ নির্বাচিত হন। ভবানীপুর কলেজে পড়ার পর মুম্বইয়ে পাড়ি দেন তিনি। সেখান থেকেই শুরু হয় মডেলিং এবং অভিনয়ের নতুন অধ্যায়। আজও বাংলা সিনেমার দর্শকদের ভালোবাসাকে নিজের জীবনের অন্যতম বড় প্রাপ্তি বলেই মনে করেন প্রিয়াঙ্কা।






