বিনোদন জগতের ঝলমলে পর্দার আড়ালে লুকিয়ে থাকে অসংখ্য না-বলা গল্প, সংগ্রাম, উদ্বেগ এবং স্মৃতি। একজন শিল্পীর সাফল্যের পিছনে যেমন থাকে কঠোর পরিশ্রম, তেমনই থাকে নানা অভিজ্ঞতা, যা দর্শকরা অনেক সময় জানতেই পারেন না। বহু বছর পরে কোনও সাক্ষাৎকারে সেই স্মৃতির ঝাঁপি খুললে উঠে আসে এমন কিছু ঘটনা, যা শিল্পীর ব্যক্তিত্ব, কাজের প্রতি নিষ্ঠা এবং সেই সময়ের চলচ্চিত্র নির্মাণের ধরণ সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে শেখায়। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে নিজের অভিনয় জীবন, নাচ, ভালোবাসা, সম্মান এবং প্রথম ছবির শুটিংয়ের নানা অজানা অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিলেন বিশিষ্ট অভিনেত্রী ও নৃত্যশিল্পী মমতা শংকর।
সাক্ষাৎকারের শুরুতেই নিজের জনপ্রিয় ডাকনাম ‘মমদি’ নিয়ে কথা বলেন মমতা শংকর। তিনি জানান, ‘মমদি’ নামটি তাঁর অত্যন্ত প্রিয়। কারণ, কেউ যখন তাঁকে এই নামে ডাকেন, তখন মনে হয় তিনি সকলেরই আপনজন। তিনি মজার ছলে জানান, স্বামী চন্দ্রোদয় ঘোষই প্রথম তাঁকে ‘মম’ নামে ডাকতেন। এমনকি প্রেম নিবেদনের সময় একটি চিরকুটে ‘মম’ লিখে দিয়েছিলেন। যদিও প্রথমে তিনি সেই শব্দের অর্থই বুঝতে পারেননি। পরে পরিবারের সদস্যদের কাছে জানতে চেয়ে বিষয়টি বুঝতে পারেন। সেই স্মৃতি আজও তাঁর কাছে অত্যন্ত বিশেষ।
নাচ এবং অভিনয়ের মধ্যে কোনটি তাঁর বেশি প্রিয় এই প্রশ্নের উত্তরে মমতা শংকর বলেন, দুটিই তাঁর কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ। তিনি এই দুই শিল্পমাধ্যমকে নিজের দুই সন্তানের সঙ্গে তুলনা করেন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আগের মতো নাচতে না পারার আক্ষেপ থাকলেও তিনি জানান, এখন নতুন ধরনের চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পাচ্ছেন, যা তাঁকে ভীষণ আনন্দ দেয়। পাশাপাশি তিনি বলেন, একজন নারী হিসেবে আত্মমর্যাদা ও ব্যক্তিত্ব বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। তাঁর মতে, সমাজে সম্মান অর্জন করতে হলে নিজের চারপাশে একটি মর্যাদার সীমারেখা তৈরি করতে হয়। তিনি জানান, দীর্ঘ অভিনয় জীবনে কখনও কোনও অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়নি, কারণ সকলেই তাঁকে যথেষ্ট সম্মান দিয়েছেন।
সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ ছিল তাঁর প্রথম ছবি ‘মৃগয়া’-র শুটিংয়ের স্মৃতিচারণ। মমতা শংকর জানান, পরিচালক মৃণাল সেন তাঁকে আগেই বলেছিলেন যে ছবিতে একটি কঠিন দৃশ্য রয়েছে, যেখানে জমিদারের লোকেরা তাঁকে জোর করে তুলে নিয়ে যাবে। এই কথা শুনে তিনি ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন। কারণ সেই সময় তাঁর পোশাক ছিল অত্যন্ত সাধারণ এবং কোনও নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই শুটিং করতে হচ্ছিল। দিনের পর দিন তিনি চিন্তায় থাকতেন কবে সেই দৃশ্যের শুটিং হবে। অবশেষে একদিন মৃণাল সেন তাঁকে সেই দৃশ্যের জন্য প্রস্তুত হতে বলেন। কিন্তু শুটিং শেষে তিনি জানতে পারেন, কোনও রকম অশালীনতা বা সরাসরি দৃশ্য দেখানো ছাড়াই পুরো ঘটনাটি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে ক্যামেরায় তুলে ধরা হয়েছে। পরে ডাবিংয়ের সময় এবং ছবির চূড়ান্ত সংস্করণ দেখে তিনি বুঝতে পারেন, কী অসাধারণ দক্ষতায় পরিচালক দৃশ্যটি নির্মাণ করেছিলেন।
বর্তমান সময়ের সিনেমা ও সমাজ নিয়েও নিজের মতামত ব্যক্ত করেন মমতা শংকর। তাঁর মতে, এখন অনেক ক্ষেত্রেই সূক্ষ্মতা বা ‘সাবটিলিটি’ হারিয়ে যাচ্ছে। আগে যেসব বিষয় ইঙ্গিতের মাধ্যমে সুন্দরভাবে তুলে ধরা হতো, এখন সেগুলো অনেক বেশি সরাসরি দেখানো হয়। তিনি মনে করেন, ভালোবাসাই পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী শক্তি এবং সেটিই মানুষের জীবনের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত। একইসঙ্গে তিনি বাড়ির শিক্ষার গুরুত্বের উপরও জোর দেন। তাঁর কথায়, স্কুল-কলেজের শিক্ষার পাশাপাশি পরিবারের মূল্যবোধই একজন মানুষকে প্রকৃত অর্থে গড়ে তোলে। দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি যে বার্তা দিয়েছেন, তা শুধু শিল্পজগতের জন্য নয়, সমাজের প্রতিটি মানুষের জন্যই সমান প্রাসঙ্গিক।






