“বাবার নামে লাল কালির দাগ, ৬ মাস কাজ ছিল না…মামার বাড়িতেই বড় হয়েছি” মাত্র ১৮ বছরে বিয়ে, ২১ বছরে সন্তান! জীবনের অজানা সংগ্রাম প্রথমবার খোলাখুলি বললেন দেবিকা মিত্র! বাধা দিয়েছিলেন পিসি, কীভাবে ঘটনাচক্রে বিনোদন জগতে পা রেখেছিলেন অভিনেত্রী?

দেবিকা মিত্র বাংলা চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনের অত্যন্ত পরিচিত এবং জনপ্রিয় প্রবীণ অভিনেত্রী। আশির দশক থেকে শুরু করে আজও তিনি সমান দক্ষতায় বড় পর্দা এবং ছোট পর্দায় অভিনয় করে চলেছেন। ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুই ধরনের চরিত্রেই তাঁর অভিনয় দর্শকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে। বিশেষ করে মা, পরিবারের প্রবীণ সদস্য কিংবা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রাভিনেত্রী হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন ধরে বাংলা বিনোদন জগতের অন্যতম নির্ভরযোগ্য মুখ। সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে নিজের অভিনয় জীবন, ছোটবেলার স্মৃতি, পারিবারিক সংগ্রাম, বিয়ে এবং অভিনয় জগতে আসার অজানা গল্প তুলে ধরেছেন অভিনেত্রী। তাঁর জীবনের নানা অভিজ্ঞতা শুনে অনেকেই নতুন করে চিনতে পেরেছেন এই বর্ষীয়ান শিল্পীকে।

সাক্ষাৎকারে দেবিকা মিত্র জানান, অভিনয় জগতে তাঁর প্রবেশ কোনও পরিকল্পনা করে নয়, বরং একেবারেই ঘটনাচক্রে। একটি ফটো স্টুডিওতে তাঁর ছবি টাঙানো ছিল। সেই ছবিই এক প্রযোজকের নজরে পড়ে এবং সেখান থেকেই অভিনয়ের সুযোগ পান তিনি। এরপর ১৯৭৫ সালে পরিচালক অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের জনপ্রিয় চলচ্চিত্র অগ্নিশ্বর-এর মাধ্যমে বড় পর্দায় তাঁর অভিনয় জীবন শুরু হয়। তারপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। লাঠি, মহান, সাথীহারা, বাজিমাত, নীল আকাশের চাঁদনী, শত্রু এবং চাঁদের পাহাড়-সহ একাধিক উল্লেখযোগ্য ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি। তবে নিজের কেরিয়ার নিয়ে বলতে গিয়ে অভিনেত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন, তিনি কোনওদিন নায়িকা হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে অভিনয়ে আসেননি। বরাবরই একজন ভালো চরিত্রাভিনেত্রী হিসেবেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। ছোটবেলা থেকেই নাচ, গান ও নাটকের সঙ্গে যুক্ত থাকায় অভিনয়ের পরিবেশ তাঁর কাছে খুবই স্বাভাবিক ছিল।

নিজের ছোটবেলার কথা বলতে গিয়ে দেবিকা মিত্র জানান, বর্তমান প্রজন্মের বেড়ে ওঠার সঙ্গে তাঁদের সময়ের অনেক পার্থক্য ছিল। তিনি মূলত উত্তর কলকাতায় মামার বাড়িতেই বড় হয়েছেন। বাড়ির পরিবেশ ছিল সংস্কৃতিমনস্ক। ছোট থেকেই খেলাধুলা, নাটক, নাচ ও গানের মধ্যেই তাঁর বেড়ে ওঠা। পাশাপাশি তিনি দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। তবে জীবনের একটা সময় তাঁদের পরিবারকে বড় আর্থিক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। অভিনেত্রীর কথায়, তাঁদের পরিবারের অধিকাংশ সদস্যই রেলে চাকরি করতেন। একসময় রেলের ধর্মঘটের সময় অনেকেই কাজে যোগ দেননি, কিন্তু তাঁর বাবা দায়িত্ব পালন করতে কাজে যোগ দিয়েছিলেন। সেই কারণেই তাঁর বাবার নামের পাশে ‘লাল কালি’ পড়ে যায় এবং তাঁকে ছয় মাসের জন্য সাসপেন্ড করা হয়। ফলে পরিবারের আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছিল। তবে সেই কঠিন সময়ে তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন পিসি, মামাসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা। তাঁদের সাহায্যেই সেই কঠিন সময় কাটিয়ে উঠতে পেরেছিল পরিবার।

অভিনয় জীবনের শুরুতে বাড়ির অধিকাংশ মানুষ তাঁকে সমর্থন করলেও একজন পিসিমার আপত্তি ছিল বলে জানান দেবিকা মিত্র। সেই পিসিমা নিজেও রেলে চাকরি করতেন এবং তিনি চেয়েছিলেন দেবিকাও যেন রেলে চাকরি করেন। তিনি অভিনেত্রীর বাবা-মাকে বলেছিলেন, মেয়েকে অভিনয়ে পাঠানো ঠিক হবে না। কারণ দেখতে সুন্দর হওয়ায় ভবিষ্যতে হয়তো তাঁকে মুম্বই নিয়ে যাওয়া হতে পারে। যদিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই আপত্তিও দূর হয়ে যায় এবং পরিবারের সকলেই তাঁর অভিনয় জীবনকে মেনে নেন। দেবিকা মিত্র জানান, পরিবারের এই সমর্থন তাঁর কাছে সবসময়ই বড় শক্তি ছিল, যা তাঁকে নিজের স্বপ্ন পূরণে সাহস জুগিয়েছে।

আরও পড়ুনঃ যাঁর মুখ সবাই চেনে, নাম জানে না কেউ! ২০০-র বেশি ছবিতে অভিনয়, অথচ শেষ জীবন কাটছে চরম দুর্দশা ও অভাবে! এবার ‘শ্রদ্ধাঞ্জলি ২০২৬’-এ সম্মানিত হলেন নিমাই ঘোষ, কিন্তু শুধু পুরস্কার দিলেই কি শিল্পীর প্রতি দায়িত্ব শেষ? একটি স্মারক কি সব ঋণ শোধ করতে পারে? বরং পাশে দাঁড়িয়ে ক’ষ্ট লাঘব করাই হোক আসল শ্রদ্ধাঞ্জলি!

ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও খোলামেলা কথা বলেছেন অভিনেত্রী। তিনি জানান, মাত্র ১৮ বছর বয়সে তাঁর বিয়ে হয় এবং ২১ বছর বয়সেই তিনি মা হন। তাঁর স্বামীর সঙ্গে পরিচয়ও হয়েছিল নাটকের সূত্রেই। তিনিও নাট্যজগতের মানুষ ছিলেন এবং নায়ক ও খলনায়ক দুই ধরনের চরিত্রেই সমান দক্ষতার সঙ্গে অভিনয় করতেন। বিয়ের পর এবং সন্তান জন্মানোর পরেও অভিনয় জীবন থেমে যায়নি, কারণ তাঁর স্বামী এবং পরিবারের সকলেই তাঁকে সবসময় পূর্ণ সমর্থন দিয়েছেন। সেই সমর্থনের কারণেই সংসার এবং অভিনয় দুই দায়িত্বই সফলভাবে সামলাতে পেরেছেন তিনি। নিজের জীবনের সংগ্রাম, পরিবারের ভালোবাসা এবং অভিনয়ের প্রতি নিষ্ঠার এই গল্পই আজও দেবিকা মিত্রকে বাংলা অভিনয় জগতের অন্যতম সম্মানিত ও অনুপ্রেরণাদায়ী শিল্পী হিসেবে আলাদা পরিচিতি এনে দিয়েছে।

You cannot copy content of this page