৮২ বছরের দীপঙ্কর দে-কে দেখে চিনতেই পারবেন না! একসময়ে বাংলা সিনেমায় নায়ক নয়, সুপুরুষ খলনায়ক হয়েই জয় করেছিলেন দর্শকের মন, আজ হাঁটতেও লাগে অন্যের সাহায্য! প্রথম সংসার ভেঙে, ৬০-এ হাঁটুর বয়সী দোলনকে বিয়ে! সাফল্য, ব্যক্তিগত দু’র্যোগ ও দীর্ঘ অভিনয়জীবন, জেনে নিন বর্ষীয়ান অভিনেতার জীবনের অজানা অধ্যায়!

বাংলা সিনেমার ইতিহাসে দীপঙ্কর দে এমন একজন অভিনেতা, যাঁর অভিনয়জীবন জুড়ে রয়েছে একের পর এক স্মরণীয় চরিত্র। একসময় লম্বা, সুদর্শন ব্যক্তিত্ব আর বুদ্ধিদীপ্ত উপস্থিতির জন্য তিনি ছিলেন দর্শকদের অন্যতম প্রিয় মুখ। বর্তমানে তাঁর বয়স ৮২। বার্ধক্যের ছাপ এখন স্পষ্ট। মুখে সাদা খোঁচা দাড়ি, শরীরও আগের মতো সঙ্গ দেয় না। হাঁটাচলার সময় প্রয়োজন হয় অন্যের সাহায্য। তবে সময়ের সঙ্গে চেহারায় পরিবর্তন এলেও তাঁর প্রতি দর্শকের ভালোবাসা এবং সম্মান এতটুকুও কমেনি। দীর্ঘ কয়েক দশকের অভিনয়জীবনে তিনি বাংলা সিনেমাকে অসংখ্য স্মরণীয় কাজ উপহার দিয়েছেন, যা আজও সমানভাবে আলোচিত।

দীপঙ্কর দে-র অভিনয়জীবনের শুরু হয় সত্যজিৎ রায়ের হাত ধরে। ১৯৭১ সালে ‘সীমাবদ্ধ’ ছবির মাধ্যমে প্রথমবার বড় পর্দায় অভিনয়ের সুযোগ পান তিনি। এরপর সত্যজিৎ রায়ের ‘আগন্তুক’, ‘শাখা প্রশাখা’ এবং ‘গণশত্রু’ ছবিতেও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে দেখা যায় তাঁকে। পড়াশোনাতেও তিনি মেধাবী ছিলেন। উচ্চমাধ্যমিকের পর প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হলেও প্রথম বর্ষে অঙ্কে ফেল করায় সেখানে পড়াশোনা আর এগোয়নি। পরে ট্রান্সফার সার্টিফিকেট নিয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং কয়েক বছর পড়াশোনা করার পর কর্মজীবনে প্রবেশ করেন।

অভিনয়ে আসার আগে একটি বিজ্ঞাপন সংস্থায় কাজ করতেন দীপঙ্কর দে। সেই সময় শ্যাম বেনেগাল, মুজাফ্ফর আলি, সুমিত, দীপঙ্কর দে এবং বান্টি রোজ মিলে একটি ফুড প্রোডাক্টের বিজ্ঞাপন তৈরির কাজ করেন। সেখান থেকেই বান্টি রোজের সঙ্গে তাঁর পরিচয়, পরে সেই সম্পর্ক বিয়েতে পৌঁছায়। চাকরি করার সময়ই তিনি সত্যজিৎ রায়কে ফোন করে অভিনয়ের ইচ্ছার কথা জানান। সেই ইচ্ছাই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। পরে শুধু সত্যজিৎ নন, বহু খ্যাতনামা পরিচালকের সঙ্গে কাজ করেন তিনি। ঋতুপর্ণ ঘোষের একাধিক ছবিতেও তাঁর অভিনয় বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়। অভিনয়ের পাশাপাশি সেতার বাজানো এবং জ্যোতিষচর্চার প্রতিও তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল।

যদিও একবার সত্যজিৎ রায়ের নাতি হবে না নাতনি, সেই ভবিষ্যদ্বাণী ঠিক না হওয়ার ঘটনাও তিনি নিজেই পরে নানা সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছেন। নায়ক হিসেবে নয়, বরং চরিত্রাভিনেতা এবং খলনায়কের ভূমিকায় দীপঙ্কর দে নিজের আলাদা পরিচয় গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর নিজের কথায়, লম্বা-চওড়া চেহারার জন্য তাঁকে নেতিবাচক চরিত্রেই বেশি মানাত। ব্যক্তিগত জীবনও নানা সময়ে আলোচনায় এসেছে। প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদের বহু বছর পর অভিনেত্রী দোলন রায়ের সঙ্গে দীর্ঘদিন একসঙ্গে থাকার পর বিয়ে করেন তিনি। তাঁদের বয়সের পার্থক্য নিয়েও কম আলোচনা হয়নি।

আরও পড়ুনঃ ‘প্রথমা কাদম্বিনী’ বনাম ‘কাদম্বিনী’ সেই চর্চিত টক্করের ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি? জি বাংলার ‘সতীপীঠ কালীঘাট’-এর পর স্টার জলসায়ও আসছে ‘পুণ্যতীর্থ কালীঘাট’? বাংলা টেলিভিশনে কি শুরু হতে চলেছে আরও এক বড় মহারণ? কোন চ্যানেলের ধারাবাহিকটি দেখবেন আপনি?

dipankar dey and tollywood actors

দীপঙ্করের প্রথম পক্ষের দুই মেয়ে টিটি ও রুমি দোলনের থেকেও বড়। বিয়ের কিছুদিন পর বড় মেয়ের অকালমৃত্যুর কঠিন সময়ে শুধু দীপঙ্কর নন, গোটা পরিবারকে সামলে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন দোলন রায়। আজ বয়সের ভারে শরীর আগের মতো শক্তিশালী নেই। হাঁটাচলা করতে অন্যের সাহায্য লাগে, চেহারাতেও এসেছে সময়ের ছাপ। তবু হাসিমুখে জীবনকে গ্রহণ করে চলেছেন এই বর্ষীয়ান অভিনেতা। প্রায় পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলা সিনেমায় তাঁর অবদান আজও সমানভাবে স্মরণ করেন দর্শক এবং সহকর্মীরা। একসময়ের সুপুরুষ নায়কের চেহারা বদলালেও তাঁর অভিনয়, ব্যক্তিত্ব এবং অসংখ্য স্মরণীয় চরিত্র তাঁকে বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে চিরকাল বিশেষ জায়গা দিয়েই রাখবে।

You cannot copy content of this page