বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ‘মহানায়ক’ নামটি উচ্চারিত হলেই প্রথম যে মুখটি ভেসে ওঠে, তিনি উত্তম কুমার। কয়েক দশক পেরিয়ে গেলেও তাঁর জনপ্রিয়তা, অভিনয় দক্ষতা এবং পর্দার জাদু আজও অম্লান। রোম্যান্টিক নায়ক থেকে শুরু করে জটিল চরিত্র প্রতিটি ভূমিকায় তিনি নিজের স্বতন্ত্র ছাপ রেখে গিয়েছেন। বাংলা সিনেমাকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তাই মৃত্যুর বহু বছর পরেও তিনি শুধু একজন অভিনেতা নন, বরং বাঙালির আবেগ, স্মৃতি এবং সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আজও বাংলা চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে উত্তম কুমার এক জীবন্ত কিংবদন্তি। নতুন প্রজন্মের দর্শকরাও তাঁর সিনেমা দেখে মুগ্ধ হন। টেলিভিশন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম কিংবা সামাজিক মাধ্যমে তাঁর ছবি ও সংলাপ এখনও সমানভাবে জনপ্রিয়। ভক্তদের কাছে তিনি শুধুই একজন তারকা নন, বরং পরিবারের একজন আপন মানুষ। তাঁর জীবন, সাফল্য এবং ব্যক্তিগত নানা ঘটনা নিয়ে মানুষের আগ্রহ আজও অটুট। আর সেই কারণেই তাঁর মৃত্যু এবং মৃত্যুর আগে বলা কিছু রহস্যময় কথাবার্তা নিয়ে আলোচনা এখনও থামেনি।
ঘনিষ্ঠ মহলের একাধিক বক্তব্য থেকে জানা যায়, জীবনের শেষ কয়েক বছরে উত্তম কুমার যেন নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অদ্ভুত এক পূর্বাভাস অনুভব করতেন। একটি বহুল আলোচিত ঘটনার কথা উল্লেখ করেছিলেন অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। ১৯৭৮ সালের দিকে সত্যজিৎ রায়, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এবং উত্তম কুমার একসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছিলেন। সেই সময় উত্তম কুমার সত্যজিৎ রায়কে প্রশ্ন করেছিলেন, “মানিকদা, আপনি আমাকে আর কোনও চরিত্রে নিচ্ছেন না?” উত্তরে সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন, বয়স বাড়লে আরও পরিণত চরিত্রে তাঁকে নেওয়ার কথা ভাবছেন। তখন উত্তম কুমারের জবাব ছিল, “আমি আর বুড়ো চরিত্র করতে পারব না, পুলু করবে।” পরে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন, সেই মন্তব্য যেন এক অদ্ভুত ভবিষ্যদ্বাণীর মতো মনে হয়েছিল। ঘনিষ্ঠদের কাছেও তিনি প্রায়ই বলতেন, “আর ভালো লাগছে না”, কিংবা “কিছু একটা ঠিক নেই।”
আরও একটি ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায় কলকাতার মেট্রো রেল নির্মাণের সময়কার। শহরের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে এক সহশিল্পী তাঁকে বলেছিলেন, মেট্রো চালু হলে কলকাতার চেহারা বদলে যাবে। উত্তম কুমারের উত্তর ছিল, “এইসব জিনিস আমি দেখতে পারব না।” এমন মন্তব্যে অনেকেই পরে বিস্মিত হয়েছিলেন। একইভাবে তিনি কাছের মানুষদের বলতেন, তিনি ক্রমশ একা হয়ে যাচ্ছেন এবং তাঁর মনে হচ্ছে কিছু একটা ঘটতে চলেছে। এসব কথাকে কেউ গুরুত্ব দেননি, কিন্তু তাঁর আকস্মিক মৃত্যুর পর সেগুলো নতুন করে আলোচনায় আসে। অভিনেতা রবি ঘোষও লিখেছিলেন, হাজার হাজার মানুষের ভালোবাসায় ঘেরা থাকলেও ব্যক্তিগত জীবনে উত্তম কুমার অনেক সময় গভীর একাকীত্ব অনুভব করতেন।
আরও পড়ুনঃ “হিরো হতে চাই, কিন্তু রাস্তাটা…” আক্ষেপ ‘খেলাঘর’ খ্যাত ‘শান্টু গুণ্ডা’, অভিনেতা সৈয়দ আরেফিনের! সবাই তাঁকে চিত্তরঞ্জনের ‘হৃতিক রোশন’ বলে ডাকত! বাড়ি থেকে পালিয়ে কলকাতায় এসেছিলেন, কিন্তু কেন বড়পর্দার নায়ক হতে পারলেন না? কেন আজও অধরা রয়ে গেল সেই স্বপ্ন? আপনার কেমন লাগে তাঁর অভিনয়?
১৯৮০ সালের জুলাই মাসে ঘটে যায় সেই মর্মান্তিক ঘটনা। জানা যায়, ২৩ জুলাই শুটিং শেষে তিনি এক হাউস পার্টিতে যোগ দিয়েছিলেন এবং গভীর রাত পর্যন্ত সেখানে ছিলেন। পরদিন ভোরে হাঁটতে বেরিয়ে তিনি বুকে ব্যথা এবং অস্বাভাবিক ঘামের কথা জানান। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ২৪ জুলাই রাত ৯টা ৩২ মিনিটে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ হয়ে পড়েছিল গোটা বাংলা। সেই সময় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় আবেগঘন প্রতিক্রিয়ায় বলেছিলেন, উত্তম কুমার নিজের শরীরের অবস্থা সম্পর্কে সচেতন ছিলেন, তবুও বিশ্রাম নেননি। মৃত্যুর পর তাঁর ডায়েরির কিছু নোট নিয়েও নানা জল্পনা তৈরি হয়। যদিও এসব ঘটনার সত্যতা নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে, তবুও মহানায়কের জীবন ও মৃত্যুকে ঘিরে এই রহস্যময় অধ্যায় আজও বাংলা চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে রয়েছে।






