“অভিনয় প্রায় বন্ধই হয়ে গিয়েছিল, শশুর বাড়িতে আপত্তি ছিল…বছরে একটা নাটক করার জন্যও লড়তে হতো, নিজের উপার্জনের টাকায়…” বিয়ের পরই বদলে গিয়েছিল জীবনের সমীকরণ! অভিনয় থেকে দূরে কাটানো ২৫ বছরের না-বলা গল্প শোনালেন কৌশিকী গুহ! বুকে চাপা ছিল স্বপ্ন, কীভাবে ছেলে-মেয়ের হাত ধরেই আবার পর্দায় ফিরলেন অভিনেত্রী?

বিনোদন জগতের তারকাদের জীবন বাইরে থেকে যতটা ঝলমলে দেখায়, বাস্তবে তার পেছনে লুকিয়ে থাকে অসংখ্য সংগ্রাম, ত্যাগ এবং অপূর্ণ স্বপ্নের গল্প। দর্শকরা পর্দায় যে সাফল্য দেখেন, তার আড়ালে থাকে বছরের পর বছর ধরে চলা লড়াই, পারিবারিক বাধা, সামাজিক প্রতিবন্ধকতা এবং নিজের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখার নিরন্তর চেষ্টা। অনেক শিল্পীকেই নিজের পছন্দের জায়গায় পৌঁছতে কঠিন পথ অতিক্রম করতে হয়। অভিনেত্রী কৌশিকী গুহর জীবনও তেমনই এক অধ্যবসায় ও আত্মবিশ্বাসের গল্প। বর্তমানে ছোটপর্দার পরিচিত মুখ কৌশিকী গুহ। তবে অভিনয়কে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার আগে তাঁর জীবন একেবারেই অন্য খাতে এগিয়েছিল।

অভিনয়ের প্রতি প্রবল টান থাকলেও দীর্ঘ সময় তিনি সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে পারেননি। সংসার, সামাজিক বাধা এবং পারিবারিক আপত্তির মধ্যেও নিজের ইচ্ছাকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন তিনি। আর সেই ইচ্ছাশক্তিই একসময় তাঁকে পৌঁছে দেয় অভিনয়ের জগতে। ১৯৯০ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে আশুতোষ কলেজে ভর্তি হন কৌশিকী। কলেজ ফেস্টেই প্রথম মঞ্চে ওঠার সুযোগ পান তিনি। সেই সময় তাঁদের পাড়ার একটি নাট্যদল থেকে তাঁকে নাটকে অংশ নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। তবে সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের মতো তাঁর বাড়িতেও গ্রুপ থিয়েটার নিয়ে আপত্তি ছিল।

পাড়ার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নিতে বাধা না থাকলেও নিয়মিত থিয়েটার করার অনুমতি পাননি। এর মধ্যেই পার্ট-ওয়ান পরীক্ষার পর তাঁর বিয়ে হয়ে যায়। শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে নতুন এক লড়াই শুরু হয়। সেখানে গান বা আবৃত্তি করতে উৎসাহ দেওয়া হলেও নাটক করার বিষয়ে আপত্তি ছিল। তবুও তিনি চেষ্টা করতেন বছরে অন্তত একটি নাটকে অংশ নিতে। ছোটবেলা থেকেই মায়ের একটি কথা তাঁর মনে গভীরভাবে গেঁথে ছিল। মা বলতেন, “তোমার বাবা বা তোমার স্বামী যতই উপার্জন করুক না কেন, পরমুখাপেক্ষী হয়ে থাকা উচিত নয়। নিজের রোজগার থাকা দরকার, স্বাবলম্বী হওয়া দরকার।” সেই শিক্ষা থেকেই অভিনয় করতে না পারার সময় তিনি ব্যবসার পথে হাঁটেন।

কখনও সাইবার ক্যাফে, কখনও কম্পিউটার সেন্টার, আবার কখনও রেস্তোরাঁর ব্যবসা শুরু করেন। তিনি জানান, নিজের উপার্জনের টাকায় প্রথম দু’চাকা এবং পরে চারচাকা গাড়ি কিনেছিলেন। তাঁর কথায়, স্বামী চাইলে হয়তো কিনে দিতে পারতেন, কিন্তু নিজের উপার্জনের টাকায় কেনার আনন্দ ছিল আলাদা। তবে ব্যবসায় সফল হলেও অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসা কখনও কমেনি। কলেজ জীবনের নাট্যদল পড়াশোনা শেষ হওয়ার পর বন্ধ হয়ে গেলেও, কলেজ ছাড়ার ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে পুরনো বন্ধুরা আবার একত্রিত হন। সিদ্ধান্ত হয় একটি নাটক মঞ্চস্থ করার। সেই নাটক থেকেই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায়। ২০১৫ সালে জনপ্রিয় ধারাবাহিক চোখের বালি-তে অভিনয়ের ডাক পান তিনি।

আরও পড়ুনঃ “আমার তো লজ্জা লাগবে…আমি বসে রয়েছি আর আমার স্বামী গিয়ে বাসন মাজছে, ঘর মুছছে, রান্না করছে!” “এটা তোমার কাজ, এটা আমার কাজ…” সংসারের কাজ কি শুধু স্ত্রীর? সুস্থ দাম্পত্য জীবনে স্বামী ও স্ত্রীর ভূমিকা ঠিক কী হওয়া উচিত, নিজের জীবনদর্শন ভাগ করে কী জানালেন মমতা শঙ্কর?

তখন তাঁর মেয়ে উচ্চমাধ্যমিকের ছাত্রী। মেয়েই তাঁকে উৎসাহ দিয়ে বলেছিল, “তুমি যখন অভিনয় ভালোবাসো এবং করতে পারো, তখন সেটা করো। আমরা সামলে নেব।” এরপর থেকেই শুরু হয় তাঁর অভিনয় জীবনের নতুন অধ্যায়। যদিও পথটা সহজ ছিল না। রাতের শুটিং, বাড়ির বাইরে সময় কাটানো, এসব নিয়ে পারিবারিক আপত্তিও ছিল। কিন্তু কৌশিকী গুহ বুঝেছিলেন, নিজের প্যাশনকে পেশায় পরিণত করতে পারলে সব বাধা অতিক্রম করা সম্ভব। তাঁর মতে, জীবনে যে কোনও স্বপ্ন পূরণ করতে হলে লড়াই করতেই হয়, আর সেই লড়াই করার সাহসটাই মানুষকে সাফল্যের পথে এগিয়ে নিয়ে যায়।

You cannot copy content of this page