বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে মহুয়া রায়চৌধুরীর নাম আজও সমান আবেগের সঙ্গে উচ্চারিত হয়। আশির দশকে একের পর এক সফল ছবির মাধ্যমে দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন তিনি। অথচ ব্যক্তিগত জীবনের গল্প ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। মাত্র ২৭ বছর বয়সে আগুনে দগ্ধ হয়ে তাঁর মৃত্যু আজও রহস্যে ঘেরা। আত্মহত্যা, নাকি পরিকল্পিত হত্যা, সেই প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর এখনও মেলেনি। ১৯৮৫ সালের ২২ জুলাই ভোর ৫টা ৫৫ মিনিটে হাসপাতালের বিছানায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন অভিনেত্রী। মৃত্যুর আগে শেষবার নিজের একমাত্র সন্তানকে দেখতে চেয়েছিলেন বলেও বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। চার দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তাঁর জীবন ও মৃত্যুর রহস্য আজও মানুষের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে রয়েছে।
মহুয়ার জীবনকে নতুন করে তুলে ধরতে তৈরি হচ্ছে প্রযোজক রানা সরকারের ছবি ‘গুনগুন করে মহুয়া’। পরিচালনায় রাজদীপ ঘোষ এবং নামভূমিকায় অভিনয় করছেন অঙ্কিতা মল্লিক। মহুয়ার মৃত্যুবার্ষিকীর দিন ভোর ৫টা ৫৫ মিনিটেই প্রকাশ্যে আনা হয়েছে অঙ্কিতার মহুয়া-লুক। এই ছবির চিত্রনাট্য তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে গবেষণাভিত্তিক দুটি বই, যার মধ্যে অন্যতম মালবিকা দাশগুপ্তের ‘আগুনে ঢেকেছি মুখ’। দীর্ঘ গবেষণার পর লেখিকা মহুয়ার জীবন সম্পর্কে এমন অনেক তথ্য সামনে এনেছেন, যা সাধারণ মানুষের অজানা ছিল। তাঁর মতে, পর্দার জনপ্রিয় নায়িকার বাস্তব জীবন ছিল অসংখ্য কষ্ট, অপমান এবং বঞ্চনায় ভরা।
মালবিকা দাশগুপ্ত দাবি করেছেন, ছোটবেলা থেকেই মহুয়ার জীবন ছিল অত্যন্ত কঠিন। জন্মদাতা তাঁকে গ্রহণ না করায় পালকপিতার কাছেই বড় হন তিনি। কিন্তু সেখানেও নিরাপদ আশ্রয় পাননি। মাত্র চার বছর বয়স থেকেই অভিনয়ের জগতে ঠেলে দেওয়া হয় তাঁকে। লেখিকার কথায়, মহুয়ার ইচ্ছায় নয়, পরিস্থিতির চাপে তাঁর অভিনয়জীবনের শুরু। আরও চাঞ্চল্যকর দাবি করে তিনি বলেন, একসময় পালকপিতা নাকি তাঁকে বিক্রি করে দেওয়ারও চেষ্টা করেছিলেন। সেই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে নিজেকে বাঁচানোর আশাতেই তিলক চক্রবর্তীর হাত ধরেছিলেন মহুয়া। পরে তাঁকে বিয়েও করেন। কিন্তু লেখিকার অভিযোগ, বিয়ের পরেও তাঁর জীবনের কষ্টের শেষ হয়নি।
গবেষণার সূত্রে মালবিকা আরও দাবি করেছেন, মহুয়ার সংসারও সুখের ছিল না। তাঁর কথায়, বাবা এবং স্বামী নাকি অভিনেত্রীকে বাংলাদেশে নীল ছবিতে অভিনয় করানোর পরিকল্পনাও করেছিলেন। ফলে যে ঘরকে নিরাপদ আশ্রয় বলে মনে করার কথা, সেটাই তাঁর কাছে ধীরে ধীরে অসহ্য হয়ে উঠেছিল। অথচ স্টুডিয়োপাড়ায় সম্পূর্ণ অন্যরকম মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন মহুয়া। সহকর্মীদের পাশে দাঁড়ানো, বিপদে মানুষের সাহায্য করা কিংবা শুটিংয়ে যাওয়ার আগে এলাকার পথকুকুরদের নিজের হাতে খাওয়ানো, এই সবকিছুর জন্য তিনি সকলের প্রিয় ছিলেন। পর্দার বাইরে তাঁর মানবিক দিকের কথাও আজও অনেকেই স্মরণ করেন।
মহুয়ার মৃত্যু নিয়েও স্পষ্ট কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায়নি। মালবিকা দাশগুপ্তের বক্তব্য, মহুয়া আত্মহত্যা করে থাকলেও তিনি অবাক হবেন না। আবার তাঁর ব্যক্তিগত ধারণা, অভিনেত্রীকে পুড়িয়ে মারাও হয়ে থাকতে পারে। কারণ, জীবনের নানা মানসিক আঘাতের পাশাপাশি একমাত্র ছেলে গোলাকেও ধীরে ধীরে তাঁর কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছিল বলে তিনি দাবি করেছেন। লেখিকার মতে, ছেলেই ছিল মহুয়ার সবচেয়ে বড় শক্তি। সেই সম্পর্কেও দূরত্ব তৈরি হওয়ায় তিনি ভীষণভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। যদিও এই সমস্ত বক্তব্য গবেষণা ও ব্যক্তিগত মূল্যায়নের ভিত্তিতে করা, ঘটনার সরকারি বা আইনি নিষ্পত্তি আজও হয়নি।
আরও পড়ুনঃ “গাদ্দার, চোর, বেইমানরা সব দল ছেড়ে চলে গেছে, তাতেই ভালো হয়েছে” যে কর্মসূচী ৪০ বছর ধরে হয়ে আসছে, পারমিশন দিলে কি মহাভারত অশুদ্ধ হতো? ২১ জুলাইয়ের মঞ্চ থেকে বি*স্ফোরক ময়না বন্দ্যোপাধ্যায়! মমতা পন্থী তৃণমূলের শুদ্ধিকরণ হয়েছে, ‘বেনোজল’ বিদায়েই নতুন শক্তি এনে দিল ডুবতে বসা দলে, দাবী অভিনেত্রীর?
মহুয়া রায়চৌধুরীর জীবন যতটা সাফল্যের, ততটাই বেদনারও। একসময় তাঁর নামেই সিনেমার টিকিট বিক্রি হতো, নায়ক যেই হোন না কেন। অথচ ব্যক্তিগত জীবনে সুখ যেন অধরাই থেকে গিয়েছিল। তাঁর জীবন নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে মালবিকা দাশগুপ্ত নিজেও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন বলে জানিয়েছেন। তবু তিনি লেখার কাজ থামাননি, কারণ তাঁর বিশ্বাস, মহুয়ার গল্প শুধু একজন অভিনেত্রীর কাহিনি নয়, বরং বহু নারীর লড়াইয়ের প্রতিচ্ছবি। তাই আজও তাঁর জীবন ও মৃত্যুর অমীমাংসিত রহস্য নতুন প্রজন্মের কাছেও সমানভাবে আলোচনার বিষয় হয়ে রয়েছে।






