উত্তম কুমারের প্রয়াণের এত বছর পরেও তাঁর স্মৃতি আজও একইভাবে আবেগ জাগায় বাংলা চলচ্চিত্র জগতে। সেই স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অভিনেতা দীপঙ্কর দে-র (Dipankar De) জীবনেরও এক কঠিন অধ্যায়। সম্প্রতি উত্তম কুমারের (Uttam Kumar) মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে নিজের পুরনো অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করতে গিয়ে তিনি এমন কিছু ঘটনা তুলে ধরেছেন, যা আজও তাঁকে মানসিকভাবে নাড়া দেয়। বিশেষ করে ‘বাঞ্ছারামের বাগান’ ছবিকে ঘিরে তৈরি হওয়া পরিস্থিতির কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, সেই সময়ে গোটা টালিগঞ্জ যেন তাঁর বিরুদ্ধেই দাঁড়িয়ে গিয়েছিল।
দীপঙ্কর দে জানান, ‘বাঞ্ছারামের বাগান’ ছবিতে প্রথমে অভিনয় করার কথা ছিল উত্তম কুমারের। কিন্তু শুটিং শুরুর আগেই অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় তাঁকে। হাসপাতাল থেকেই তিনি ছবির চিত্রনাট্য পড়ছিলেন। পরে সুস্থ হয়ে ফিরলেও তিনি শুটিংয়ের দিন পিছিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু সেই সময় সূর্যপুরে ছবির জন্য বিশেষভাবে একটি বাগানের সেট তৈরি হয়ে গিয়েছিল। সব প্রস্তুতি সম্পূর্ণ ছিল। দিন পিছোলে প্রযোজকের বড় আর্থিক ক্ষতি হতো, এমনকি বাগানটিও নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। সেই কারণেই পরিচালক তপন সিনহা শেষ পর্যন্ত উত্তম কুমারের কাছ থেকে চিত্রনাট্য ফেরত আনিয়ে নতুন অভিনেতার খোঁজ শুরু করেন।
এর কিছুদিন পর তপন সিনহার অফিসে ডাকা হয় দীপঙ্কর দে-কে। সেখানে তাঁকে জানানো হয়, যে চরিত্রটি উত্তম কুমারের করার কথা ছিল, সেটিই তাঁকে করার প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে। এই প্রস্তাব শুনে তিনি নিজেই অবাক হয়ে যান এবং প্রশ্ন করেন, “যে চরিত্র উত্তম কুমারের করার কথা ছিল, সেটা কি আমি পারব?” তখন তপন সিনহা তাঁকে বলেন, “ও সব তুমি আমার উপর ছেড়ে দাও। দেখছি কী করা যায়?” এরপর রিহার্সাল শুরু হয় এবং শেষ পর্যন্ত দীপঙ্কর দে-ই ওই চরিত্রের জন্য নির্বাচিত হন। শুটিংও শুরু হয়ে যায়। তবে সেই সময়ই উত্তম কুমার পরিচালকের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন। পরে সেই মামলায় তিনি হেরে যান।
এই ঘটনার সবচেয়ে বড় আক্ষেপ আজও বয়ে বেড়ান দীপঙ্কর দে। তাঁর কথায়, তিনি কখনওই উত্তম কুমারের জায়গা নিতে চাননি। বরং তিনি তপন সিনহাকে বলেছিলেন, “উত্তমদাকে একবার ফোন করে অনুমতি নিই।” কিন্তু পরিচালক স্পষ্ট জানিয়ে দেন, “তুমি কাউকে ফোন করবে না।” দীপঙ্কর দে মনে করেন, বিষয়টি নিয়ে যদি একবার উত্তম কুমারের সঙ্গে কথা বলতে পারতেন, তাহলে হয়তো অনেক ভুল বোঝাবুঝির অবসান হতো। তিনি আজও বিশ্বাস করেন, “আমি তো শিল্পী। তাঁর জায়গা কেউ নিতে পারবে না।” সেই সময় উত্তম কুমারের মনে হয়তো কিছু অভিমান তৈরি হয়েছিল, যা আর কোনওদিন ভাঙানো সম্ভব হয়নি।
এরপর ২৪ জুলাই রাতে আচমকাই আসে উত্তম কুমারের মৃত্যুর খবর। সেই সংবাদ শুনে তিনিও ভবানীপুরের বাড়িতে শেষবারের মতো শ্রদ্ধা জানাতে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে যাওয়ার আগেও তাঁর মনে দ্বিধা ছিল। কারণ, তাঁর কথায়, “গোটা টালিগঞ্জের সকলেই প্রায় আমার বিরুদ্ধে। কারণ, একটাই। কেন উত্তমদার জায়গায় আমি অভিনয় করেছি?” শেষ পর্যন্ত তিনি সেখানে পৌঁছে দেখেন, বরফের উপর শায়িত রয়েছেন মহানায়ক। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার শক্তিও তাঁর ছিল না। এক ঝলক দেখেই তিনি সেখান থেকে ফিরে আসেন। সেই মুহূর্ত আজও তাঁর স্মৃতিতে অমলিন হয়ে রয়েছে।
আরও পড়ুনঃ “চুড়ি পরা হাজার হাত ক্ষমতার হাতে হাতকড়া পরাবে শিগগিরই!” ‘চুড়ি পরে বসে থাক’ এই লিঙ্গবৈষ’ম্যমূলক অ’সুখে যারা আক্রান্ত, তাদের জবাব দিচ্ছে ভারতবর্ষের নতুন প্রজন্ম? রিয়া আহিরকে সামনে রেখে দিল্লিতে আন্দোলনরত পড়ুয়াদের সমর্থনে সরব ঋদ্ধি সেন, অভিনেতার পোস্ট ঘিরে জোর বিতর্ক!
দীপঙ্কর দে শেষ পর্যন্ত স্পষ্ট জানিয়েছেন, ‘বাঞ্ছারামের বাগান’-এ অভিনয়ের সুযোগ পাওয়া তাঁর জীবনের বড় ঘটনা হলেও, এই অধ্যায় তাঁকে আনন্দের চেয়ে বেশি কষ্টই দিয়েছে। তাঁর মতে, উত্তম কুমারের মতো শিল্পীর সঙ্গে নিজের কোনও তুলনাই হয় না। তিনি অকপটেই বলেন, “আমি বিশ্বাস করি, উত্তমদার মতো অত বড় শিল্পী ‘বাঞ্ছারামের বাগান’-এ আমার থেকে অনেক ভালো অভিনয় করতেন।” এত বছর পরেও মহানায়কের প্রতি তাঁর সেই শ্রদ্ধা, সম্মান এবং না বলতে পারা কথার আক্ষেপ আজও একইরকম রয়ে গেছে।






