“আমি ওনাকে অ্যাডমায়ার করছি, আমাদের দলের না হলেও…” চন্দন সেনের প্রশংসায় পঞ্চমুখ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়! বিরোধী শিবিরের অভিনেতাকে নিয়ে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্যে সরগরম রাজ্য রাজনীতি! নেপথ্যে কোন ঘটনার যোগ?

বিনোদন জগতের তারকারা শুধু অভিনয় বা শিল্পচর্চার মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখেন না। সমাজ, সংস্কৃতি, গণতন্ত্র কিংবা মানুষের অধিকার নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও তাঁরা নিজেদের মতামত প্রকাশ করেন। বহু সময় তাঁদের বক্তব্য সাধারণ মানুষের মধ্যে আলোচনার জন্ম দেয় এবং সমাজের চলমান নানা ইস্যুকে নতুন করে ভাবার সুযোগ করে দেয়। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যে উঠে এল এমনই এক শিল্পীর নাম নাট্যকার ও অভিনেতা চন্দন সেন। একটি জনসভা থেকে তাঁর বক্তব্যের প্রশংসা করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতা থাকলেও সমাজ ও সংস্কৃতির স্বার্থে যে কথা বলা দরকার, চন্দন সেন সেই সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন।

চন্দন সেন দীর্ঘদিন ধরেই বাংলা নাট্যজগতের অন্যতম পরিচিত মুখ। অভিনয় এবং নাট্যচর্চার পাশাপাশি সমাজের বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে তাঁকে সরব হতে দেখা যায়। সংস্কৃতি ও গণতন্ত্রের প্রশ্নে তিনি বরাবরই নিজের অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কেও তিনি প্রকাশ্যে প্রতিবাদ জানান। তাঁর বক্তব্য ছিল, বাংলা নাট্যাঙ্গনের ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক পরিসরকে কোনও রাজনৈতিক রঙে রাঙিয়ে দেওয়া উচিত নয়। এই ঘটনার প্রতিবাদে তিনি অন্যান্য নাট্যব্যক্তিত্বদের সঙ্গে সরব হয়েছিলেন এবং সংস্কৃতির স্বাধীনতা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

সম্প্রতি একটি মঞ্চ থেকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চন্দন সেনের একটি ভিডিও দেখার কথা উল্লেখ করে বলেন, “আমি একজনকে অ্যাডমায়ার করছি। তিনি আমাদের দলের না হলেও একজন বিখ্যাত শিল্পী। তাঁর নাম চন্দন সেন।” মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসকে গেরুয়া রঙে রাঙানোর ঘটনায় চন্দন সেন যে প্রতিবাদ করেছেন, তা তিনি সমর্থন করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, চন্দন সেন বলেছেন, “এরকম তো আমরা জীবনে দেখিনি। এই একটা সময় সবাইকে উঠে দাঁড়াতে হবে, একজোট হয়ে লড়তে হবে।” মুখ্যমন্ত্রী জানান, এই বার্তাকে তিনি সম্পূর্ণভাবে সমর্থন করেন। একই সঙ্গে তিনি রাজনৈতিক বিভাজন ভুলে বৃহত্তর গণতন্ত্র রক্ষার স্বার্থে একসঙ্গে লড়াই করার আহ্বান জানান।

উল্লেখ্য, সম্প্রতি অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসের একাংশ গেরুয়া রঙে রাঙানো এবং গেটের সামনে ভারতমাতার ছবি টাঙানোকে কেন্দ্র করে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। অভিযোগ ওঠে, একদল বিজেপি কর্মী সংস্কৃতির পরিসরে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছেন। যদিও বিজেপির পক্ষ থেকে সেই অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করা হয়। ঘটনার প্রতিবাদে চন্দন সেন-সহ একাধিক নাট্যব্যক্তিত্ব ‘দখলমুক্ত হোক নাট্য অঙ্গন’ স্লোগান তুলে সরব হন। পরে তাঁরা বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে অ্যাকাডেমি-কাণ্ডের পুনরাবৃত্তি রোধ, সরকারি প্রেক্ষাগৃহ বণ্টন এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের মতামত গ্রহণের মতো একাধিক দাবি তুলে ধরেন।

আরও পড়ুনঃ “আমি সারা রাত ধরে কেঁদেছি, এই প্রজন্মের কাছ থেকেই নতুন করে শিখলাম…” দিল্লির ছাত্রদের আন্দোলন দেখে আবেগে ভাসলেন অপর্ণা সেন! দেশবিরোধী তকমার ভয় ও গণতন্ত্রের লড়াইয়ে তরুণ প্রজন্মকে দিলেন কী বার্তা? কেন তাঁদের সামনে মাথা নত করে নিজেকে ঋণী বললেন বর্ষীয়ান অভিনেত্রী?

শমীক ভট্টাচার্য নাট্যব্যক্তিত্বদের সমস্ত বক্তব্য গুরুত্ব দিয়ে শোনার আশ্বাস দেন এবং জানান, অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসের ঘটনায় বিজেপির কোনও সাংগঠনিক ভূমিকা ছিল না। তিনি আরও দাবি করেন, যাঁরা ওই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাঁদের অনেকেই অতীতে তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং বর্তমানে নিজেদের বিজেপি সমর্থক হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন। অন্যদিকে, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য নতুন করে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও একজন শিল্পীর প্রতিবাদী অবস্থানকে প্রকাশ্যে সম্মান জানানো এবং গণতন্ত্র ও সংস্কৃতি রক্ষার প্রশ্নে একজোট হওয়ার বার্তা নিঃসন্দেহে এই বিতর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে। বর্তমানে তাই প্রশ্ন উঠছে, সংস্কৃতির পরিসর কি রাজনৈতিক রঙের ঊর্ধ্বে থাকবে, নাকি আগামী দিনে এই বিতর্ক আরও বড় আকার নেবে সেই দিকেই নজর রাজ্যের সাংস্কৃতিক মহলের।

You cannot copy content of this page