বিনোদন জগতের বহু জনপ্রিয় মুখ সময়ের সঙ্গে সক্রিয় রাজনীতির ময়দানে পা রেখেছেন। অভিনয় জীবনের সাফল্যকে পেছনে ফেলে মানুষের জন্য কাজ করার উদ্দেশ্যে তাঁরা বেছে নিয়েছেন জনজীবনের আরও কঠিন একটি পথ। সেই তালিকায় অন্যতম নাম প্রখ্যাত অভিনেত্রী রূপা গঙ্গোপাধ্যায় (Roopa Ganguly)। বাংলা এবং হিন্দি টেলিভিশন জগতের অত্যন্ত পরিচিত এই অভিনেত্রী দীর্ঘদিন ধরেই দর্শকদের ভালোবাসা পেয়েছেন তাঁর অভিনয়ের জন্য। তবে শুধুমাত্র অভিনয়ের মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ না রেখে তিনি সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে যোগ দিয়ে সমাজের বিভিন্ন সমস্যার বিরুদ্ধে সরব হওয়ার পথ বেছে নেন। তাঁর রাজনৈতিক সফর যেমন প্রশংসিত হয়েছে, তেমনই এই পথ তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতেও বাধ্য করেছে বলে সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে অকপটে জানিয়েছেন তিনি।
২০১৫ সালে ভারতীয় জনতা পার্টিতে (বিজেপি) যোগদানের মাধ্যমে রূপা গাঙ্গুলীর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয়। বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি মহিলা মোর্চার সভাপতির দায়িত্ব পান। এরপর ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে রাষ্ট্রপতি তাঁকে রাজ্যসভার সংসদ সদস্য হিসেবে মনোনীত করেন। ২০২২ সাল পর্যন্ত তিনি রাজ্যসভার সাংসদ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সংসদীয় কার্যক্রমের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক ইস্যুতে তিনি সরব থেকেছেন। নারী সুরক্ষা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের সমস্যা নিয়ে রাজ্যের বিভিন্ন আন্দোলনে তাঁকে সামনের সারিতে দেখা গিয়েছে। একজন জনপ্রিয় অভিনেত্রীর সেলিব্রিটি পরিচয়কে অনেকটাই পিছনে ফেলে মাঠে নেমে রাজনৈতিক কর্মী হিসেবেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছেন তিনি।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে রাজনীতি তাঁর ব্যক্তিগত জীবন থেকে কী কী কেড়ে নিয়েছে, সেই প্রসঙ্গেই আবেগঘন মন্তব্য করেন রূপা গাঙ্গুলী। তাঁর কথায়, “আমার জীবনের ছোট ছোট আনন্দগুলো, যা ছিল, সব হারিয়ে ফেলেছি। রাজনীতি আমার থেকে অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছে। আমার হাসি কেড়ে নিয়েছে, আমার আনন্দ কেড়ে নিয়েছে, সব কেড়ে নিয়েছে।” তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, বাইরে থেকে রাজনীতিকে যতটা সহজ বা আকর্ষণীয় মনে হয়, বাস্তবে এই পথ অত্যন্ত কঠিন। তাঁর মতে, রাজনীতি কোনও শখের বিষয় নয়। এটি মানুষের জীবন-মরণের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি দায়িত্বপূর্ণ ক্ষেত্র, যেখানে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের কষ্ট, বঞ্চনা এবং দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হয়। আর সেই বাস্তবতাই একজন রাজনৈতিক কর্মীর মানসিক জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে।
আরও পড়ুন: শুয়ে আছেন বিছানায়, হাতে চ্যানেল! জন্মদিনের প্রাক্কালে হাসপাতালে ভর্তি তন্বী লাহা রায়! শারীরিক পরীক্ষায় ধরা পড়ে জরা’য়ুতে ভয়ঙ্কর সমস্যা, তড়িঘড়ি করতে হয়েছে অ’স্ত্রপ্রচার! এখন কেমন আছেন অভিনেত্রী?
রূপা গাঙ্গুলী আরও বলেন, রাজনীতি করতে গেলে অসীম পরিশ্রমের পাশাপাশি মানসিক কষ্টও বহন করতে হয়। মানুষের দুর্দশা কাছ থেকে দেখতে দেখতে অনেক সময় নিজের ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের কথাই ভুলে যেতে হয়। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, যদি কোনও শিশুর হাত-পা ভেঙে দেওয়ার মতো নৃশংস ঘটনার কথা জানা যায়, তাহলে সেটি নিজের পরিবারের কেউ না হলেও সেই কষ্ট অনুভব করা যায়। এমনকি রাস্তায় কোনও অচেনা মানুষের দুর্ঘটনা দেখলেও তাঁর মন ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। একজন সাধারণ মানুষের কষ্ট তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। তাঁর কথায়, কোনও মানুষকে ব্যক্তিগতভাবে না চিনলেও তাঁর যন্ত্রণা একজন সংবেদনশীল মানুষের মনে প্রভাব ফেলে। সংবাদমাধ্যমে কোনও নির্যাতন, দুর্ঘটনা বা অন্যায়ের খবর পড়লেও তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন বলে জানান।
রূপা গাঙ্গুলীর এই বক্তব্য রাজনীতির এক ভিন্ন বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। অনেকেই রাজনীতিকে ক্ষমতা কিংবা পরিচিতি অর্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখলেও, তাঁর অভিজ্ঞতা বলছে সম্পূর্ণ অন্য কথা। মানুষের পাশে দাঁড়ানোর দায়িত্ব নিতে গিয়ে তাঁকে ব্যক্তিগত জীবনের বহু আনন্দ বিসর্জন দিতে হয়েছে। একজন অভিনেত্রী হিসেবে যে জীবন ছিল আলো, ক্যামেরা এবং করতালিতে ভরা, রাজনৈতিক জীবনে সেই জায়গা নিয়েছে মানুষের দুঃখ-কষ্ট, আন্দোলন, প্রতিবাদ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা। রাজনীতিতে আসার পর তাঁর জীবনে যে বড় পরিবর্তন এসেছে, তা অকপটেই স্বীকার করেছেন রূপা গাঙ্গুলী। তাঁর এই মন্তব্য অনেকের কাছেই রাজনীতির অন্তরালের কঠিন বাস্তবকে নতুন করে তুলে ধরেছে।






