বিনোদন জগতের তারকাদের জীবনকে বাইরে থেকে যতটা ঝলমলে মনে হয়, বাস্তবে তার আড়ালে লুকিয়ে থাকে অসংখ্য অভিজ্ঞতা, মতামত এবং এমন কিছু দৃষ্টিভঙ্গি, যা খুব কমই দর্শকদের সামনে আসে। বহু শিল্পীই দীর্ঘ অভিনয়জীবনের নানা স্মৃতি, ইন্ডাস্ট্রির পরিবর্তন কিংবা তথাকথিত ‘স্বর্ণযুগ’ নিয়ে নিজের মনের কথা প্রকাশ করেন না। তবে কখনও কোনও খোলামেলা সাক্ষাৎকারে সেই অজানা ভাবনাগুলিই সামনে আসে। আর তখনই বোঝা যায়, জনপ্রিয়তার আড়ালে থাকা শিল্পীর দৃষ্টিভঙ্গি কতটা ভিন্ন হতে পারে। সম্প্রতি এমনই এক সাক্ষাৎকারে বাংলা চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনের বর্ষীয়ান অভিনেতা ফাল্গুনী চট্টোপাধ্যায় নিজের দীর্ঘ অভিনয়জীবনের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন এবং বাংলা সিনেমার অতীত ও বর্তমান নিয়ে অকপট মত প্রকাশ করেন।
সাক্ষাৎকারে ফাল্গুনী চট্টোপাধ্যায় স্পষ্ট ভাষায় জানান, তিনি কোনও বিষয়কে আবেগ দিয়ে নয়, বাস্তবতা দিয়ে বিচার করতে পছন্দ করেন। বাংলা চলচ্চিত্রের অতীতকে ঘিরে মানুষের মধ্যে যে নস্ট্যালজিয়া রয়েছে, সেটিকে তিনি সম্মান করলেও কিছু প্রচলিত ধারণার সঙ্গে তিনি একমত নন। বিশেষ করে বাংলা সিনেমার তথাকথিত ‘স্বর্ণযুগ’ নিয়ে যে আলোচনা হয়, তা নিয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন অভিনেতা। তাঁর বক্তব্য, সময় বদলেছে, দর্শকের রুচি বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে তাই শুধুমাত্র অতীতকে শ্রেষ্ঠ বলে বর্তমানকে খাটো করা ঠিক নয়।
এই প্রসঙ্গেই ফাল্গুনী চট্টোপাধ্যায় বলেন, “স্বর্ণযুগের তারকা ছিল একথা আমি মানি না।” তাঁর মতে, প্রতিটি সময়েই অসাধারণ অভিনেতা-অভিনেত্রী জন্মেছেন এবং প্রত্যেক প্রজন্মের শিল্পীদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তিনি বলেন, উত্তম কুমার, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বা সেই সময়ের কিংবদন্তিদের অবদান অবশ্যই অনস্বীকার্য। কিন্তু শুধুমাত্র তাঁদের সময়কেই ‘স্বর্ণযুগ’ বলে চিহ্নিত করলে বর্তমান প্রজন্মের শিল্পীদের প্রতি অবিচার করা হয়। কারণ, আজও বহু প্রতিভাবান অভিনেতা কঠোর পরিশ্রম করে দর্শকদের ভালো কাজ উপহার দিচ্ছেন। তাই একটি নির্দিষ্ট সময়কে শ্রেষ্ঠ বলে বাকি সময়কে গুরুত্বহীন করে দেখার কোনও যুক্তি তিনি খুঁজে পান না।
অভিনেতার মতে, একটি সময়কে মহান করে তোলে শুধু তারকা নন, সেই সময়ের গল্প, চিত্রনাট্য, পরিচালক, প্রযুক্তি এবং দর্শকের গ্রহণযোগ্যতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর বক্তব্য, প্রতিটি যুগের নিজস্ব শক্তি ও সীমাবদ্ধতা থাকে। অতীতের অনেক ছবি আজও ক্লাসিক হয়ে আছে, আবার বর্তমানেও এমন অনেক কাজ হচ্ছে, যা আগামী দিনে একই মর্যাদা পেতে পারে। তাই শুধুমাত্র নস্ট্যালজিয়ার কারণে অতীতকে অতিরঞ্জিত করা উচিত নয়। বরং শিল্পকে সময়ের প্রেক্ষিতে বিচার করাই বেশি যুক্তিযুক্ত। তাঁর মতে, একজন ভালো শিল্পীর পরিচয় কোনও নির্দিষ্ট যুগে সীমাবদ্ধ থাকে না; ভালো অভিনয় সব সময়েই দর্শকের মনে জায়গা করে নেয়।
আরও পড়ুনঃ ডি.লিট সম্মানে সম্মানিত হলেন সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়! বাবা-মা একটি পুত্রের আশায় থাকলেও, বারবার হয় কন্যাসন্তানের জন্ম! ৯ বোনের দায়িত্বই এসে পড়ে তাঁর কাঁধে! বিশেষ দিনে, শৈশবের অজানা সংগ্রাম ও ক’ষ্টের স্মৃতি ভাগ করে আবেগে ভাসলেন কিংবদন্তি অভিনেত্রী!
ফাল্গুনী চট্টোপাধ্যায়ের এই মন্তব্য ইতিমধ্যেই সিনেমাপ্রেমীদের মধ্যে নতুন করে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। অনেকেই তাঁর বক্তব্যকে বাস্তবসম্মত বলে মনে করছেন, আবার কেউ কেউ ‘স্বর্ণযুগ’ নিয়ে তাঁর মতের সঙ্গে একমত নন। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট অভিনেতা নিজের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই এই মত প্রকাশ করেছেন এবং বাংলা চলচ্চিত্রকে তিনি কোনও নির্দিষ্ট সময়ের গণ্ডিতে আটকে দেখতে রাজি নন। তাঁর মতে, শিল্পের মূল্যায়ন হওয়া উচিত কাজের গুণমান দিয়ে, সময়ের পরিচয় দিয়ে নয়। আর সেই কারণেই তাঁর এই মন্তব্য বাংলা চলচ্চিত্রের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক এবং আলোচনার জন্ম দিয়েছে।






