বিনোদন জগতের শিল্পীদের ক্যামেরার সামনে যতটা সাফল্য, জনপ্রিয়তা আর গ্ল্যামারের আলোয় দেখা যায়, তার পিছনে অনেক সময় লুকিয়ে থাকে দীর্ঘ ত্যাগ, অসংখ্য আপস এবং কঠিন সংগ্রামের গল্প। পর্দায় কয়েক মিনিটের উপস্থিতির জন্যও বহু শিল্পীকে পাড়ি দিতে হয় দীর্ঘ পথ। কখনও কাজের অনিশ্চয়তা, কখনও আর্থিক চাপ, আবার কখনও পরিবার ও পেশার মধ্যে ভারসাম্য রাখার কঠিন লড়াই সবকিছুর মধ্যেই এগিয়ে যেতে হয় তাঁদের। দর্শকের চোখে যে জীবনটা ঝলমলে, বাস্তবে সেই জীবনের পিছনে কতটা পরিশ্রম থাকে, তা অনেক সময় সামনে আসে না। অভিনেত্রী অঞ্জনা বসুর জীবনকাহিনির একটি ঘটনা যেন সেই অদেখা সংগ্রামেরই ছবি।
বাংলা বিনোদন জগতের পরিচিত মুখ অঞ্জনা বসু দীর্ঘদিন ধরে টেলিভিশন ও সিনেমায় অভিনয় করছেন। একাধিক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে নিজের আলাদা জায়গা তৈরি করেছেন তিনি। তবে অভিনয়ের পাশাপাশি সংসার এবং সন্তানের দায়িত্বও সমানভাবে সামলেছেন অঞ্জনা। সাক্ষাৎকারে নিজের জীবনের নানা কঠিন সময়ের কথা বলতে গিয়ে জানিয়েছেন, পরিবার তাঁর কাছে সবসময়ই অগ্রাধিকার পেয়েছে। বিশেষ করে ছেলের ভবিষ্যতের জন্য নিজের আরাম-আয়েশকে একাধিকবার পিছনে সরিয়ে রেখেছেন তিনি। এমনকি কাজের প্রয়োজনে পাটনা থেকে কলকাতায় নিয়মিত যাতায়াত করতেন। সেই যাতায়াতের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে যে ঘটনা তিনি জানিয়েছেন, তা রীতিমতো অবাক করার মতো।
অঞ্জনা জানান, একসময় কাজের জন্য তাঁকে নিয়মিত পাটনা থেকে কলকাতা আসতে হত। প্রায় ১০ ঘণ্টার যাত্রা পেরিয়ে কলকাতায় এসে সারাদিন শুটিং করে আবার রাতের ট্রেনে পাটনায় ফিরতেন তিনি। কখনও পরপর দু’তিন দিনের শুটিং থাকলে কলকাতায় আত্মীয় বা বন্ধুর বাড়িতে থেকে যেতেন। কিন্তু একবার আচমকাই পরদিন থেকে শুটিংয়ের খবর আসে। হাতে কোনও ট্রেনের টিকিট নেই, অথচ সময়মতো কলকাতায় পৌঁছতেই হবে। বাধ্য হয়ে ভোর পাঁচটায় পাটনা থেকে লোকাল ট্রেনে রওনা দেন অভিনেত্রী। একের পর এক ট্রেন বদলে ঝাঁঝা, মোকামা, আসানসোল, দুর্গাপুর, বর্ধমান হয়ে কলকাতার দিকে এগিয়ে আসেন। দীর্ঘ এই সফরের শেষে রাত প্রায় সাড়ে ১২টা নাগাদ লিলুয়ায় পৌঁছন তিনি।
এরপরই ঘটে সেই ঘটনা, যা তাঁর সংগ্রামের ছবিটাকে আরও স্পষ্ট করে দেয়। অঞ্জনার শ্বশুরবাড়ি ছিল বেলুড়ে। রাত সাড়ে ১২টার পর হাওড়া পৌঁছলে সেখান থেকে বাড়ি ফেরার মতো কোনও যান পাওয়া কঠিন হবে বুঝতে পারেন তিনি। তাই লিলুয়ায় নামার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু ট্রেন পুরোপুরি থামার সুযোগ ছিল না। ট্রেনটি ধীরে হওয়ার সময়ই মালপত্র নিয়ে নামতে গিয়ে তিনি বুঝতে পারেন, সেটি আর দাঁড়াবে না। তখন আর উপায় না দেখে চলন্ত ট্রেন থেকেই মালপত্র-সহ প্ল্যাটফর্মে ঝাঁ*প দিয়ে নামেন অঞ্জনা। এই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথাও তিনি অকপটে জানিয়েছেন। তাঁর কথায়, এই সমস্ত কষ্টের পিছনে একটাই উদ্দেশ্য ছিল ছেলের ভবিষ্যৎ যেন ভালো হয় এবং তাঁকে নিজের পায়ে দাঁড় করাতে পারেন।
আরও পড়ুনঃ “চোখই যেন কথা বলে, সংলাপের প্রতিটি শব্দে আলাদা তেজ!” “এমন সুস্মিতাকে আগে কখনও দেখিনি, শুধু সুন্দরী নন, বলতেই হচ্ছে দুর্দান্ত অভিনেত্রীও!” বাচনভঙ্গি থেকে চোখের ভাষা, সবটাই অসাধারণ! ‘রোমান্টিক নায়িকা’ তকমা ভেঙে বাজিমাত, ‘তিলোত্তমা’য় সুস্মিতা দে-র দুর্দান্ত অভিনয়ে মুগ্ধ দর্শক! এক সপ্তাহেই মন জয় করল স্টার জলসার নতুন ধারাবাহিক!
আজ ছেলের সাফল্যের দিকে তাকিয়ে সেই পুরনো দিনের কষ্টকে আর আফসোস বলে মনে হয় না অঞ্জনার। বরং তাঁর মনে হয়, সেই সংগ্রাম সার্থক হয়েছে। পাটনা থেকে কলকাতার দীর্ঘ ট্রেনযাত্রা, রাতের সফর, শুটিংয়ের চাপ কিংবা প্রয়োজনের সময় ঝুঁকি নিয়ে বাড়ি ফেরার সেই দিনগুলি তাঁর জীবনেরই অংশ। একইসঙ্গে তিনি বুঝিয়েছেন, একজন অভিনেত্রীর জীবন শুধু ক্যামেরা, আলো আর মেকআপের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার পিছনে থাকে পরিবারকে সময় দেওয়ার লড়াই, সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার চেষ্টা এবং নিজের দায়িত্বকে শেষ পর্যন্ত ধরে রাখার মানসিকতা। অঞ্জনা বসুর সেই অভিজ্ঞতা তাই শুধু একজন অভিনেত্রীর স্ট্রাগলের গল্প নয়, বরং নিজের স্বপ্ন ও পরিবারের ভবিষ্যতের জন্য লড়ে যাওয়া এক মায়েরও গল্প।






