অভিনেতা, পরিচালক, গায়ক ও লেখক বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী অঞ্জন দত্ত বাংলা সংস্কৃতির জগতে নিজের আলাদা জায়গা তৈরি করেছেন। তাঁর ছবি ও গান যেমন মানুষের ব্যক্তিগত সম্পর্ক, ভালোবাসা, ভুল বোঝাবুঝি এবং জীবনের টানাপোড়েনকে তুলে ধরে, তেমনই নিজের জীবন নিয়েও বরাবর খোলামেলা অঞ্জন। সম্প্রতি তাঁর নতুন ছবি ‘দেরি হয়ে গেছে’ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সম্পর্ক, ক্ষমা চাওয়া এবং দাম্পত্য জীবনের নানা অভিজ্ঞতা নিয়ে অকপট হয়েছেন তিনি। কথার ফাঁকে উঠে এসেছে তাঁর স্ত্রী ছন্দা দত্তের সঙ্গে দীর্ঘ পথচলার এমন কিছু কথা, যা তাঁর জীবনের ব্যক্তিগত লড়াই এবং সম্পর্কের প্রতি দায়বদ্ধতার অন্য দিক সামনে আনে।
অঞ্জনের মতে, সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভুল হলে অহংকার ধরে রাখার কোনও অর্থ নেই। তাই সমস্যা হলে তিনি নিজে থেকে ফোন করে বা দেখা করে ‘সরি’ বলে বিষয়টি মিটিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। তাঁর কথায়, পৃথিবী নিখুঁত নয়, যোগাযোগের মাধ্যমেই অনেক জটিলতা সহজ করা সম্ভব। তবে কোনও সম্পর্কের ক্ষেত্রে নৈতিকতার সীমা লঙ্ঘন হলে তিনি সেই সম্পর্ক থেকে দূরে সরে যান। পরিবার হোক বা কাজের জায়গা ভুল বোঝাবুঝি জমিয়ে না রেখে নিজের দায়িত্ব নিয়ে তা মিটিয়ে ফেলার পক্ষেই তিনি। আর এই প্রসঙ্গেই নিজের দাম্পত্য জীবনের কথাও উঠে আসে।
নিজের বৈবাহিক জীবন নিয়ে অঞ্জন জানান, তাঁর স্ত্রীকে অনেক সময় সংসারের দায়িত্ব বেশি সামলাতে হয়েছে। এমনও সময় এসেছে যখন তিনি নিজে সংসার চালাতে পারেননি এবং স্ত্রীই পরিবারকে ধরে রেখেছেন। এই পরিস্থিতির জন্য আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে তাঁকে কম সমালোচনা শুনতে হয়নি। ‘ছেলে হয়ে স্ত্রীর উপর নির্ভর’ করার জন্য তাঁকে নানা কথা শুনতে হয়েছে বলেও জানান অঞ্জন। তবে স্ত্রী ছন্দা সেই চাপকে কীভাবে সামলেছেন, সেটিই তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ। অঞ্জনের কথায়, জীবনের সেই কঠিন সময়ে তিনজন মানুষ মৃণাল সেন, অপর্ণা সেন এবং বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত কখনও তাঁকে বা তাঁর স্ত্রীকে দোষারোপ করেননি। বরং তাঁরা ছন্দাকে ফোন করে পরিস্থিতি বুঝতে এবং মন খারাপ না করতে বলেছিলেন।
তবে দাম্পত্য সম্পর্কে শুধু অর্থনৈতিক দায়িত্বই নয়, পারস্পরিক বোঝাপড়ার গুরুত্বও তুলে ধরেছেন অঞ্জন। তাঁর স্বীকারোক্তি, কাজের ব্যস্ততায় স্ত্রীকে অনেক সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে, ভুল বোঝাবুঝি ও মান-অভিমানও হয়েছে। কিন্তু একটা পর্যায়ে গিয়ে তিনি বুঝেছেন, শুধু নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকলে সম্পর্ককে ধরে রাখা যায় না। তাই স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে পৃথিবী দেখার চেষ্টা করেছেন, সঞ্চয়ের বদলে একসঙ্গে সময় কাটানোকে গুরুত্ব দিয়েছেন। স্ত্রীর অবসর নেওয়ার পরও তাঁকে নতুন কিছু করার উৎসাহ দিয়েছেন নিজের রান্নাঘর শুরু করা কিংবা নিজের মতো করে কোনও কাজে যুক্ত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে দুজনেরই নিজের জায়গা থেকে চেষ্টা প্রয়োজন।
আরও পড়ুন: “বিয়ের ছয় মাসের মাথায় বুঝতে পেরেছিলাম অনেক কিছু ঠিক নেই…” দীর্ঘদিনের প্রেমের পর সেরেছিলেন আইনি বিয়ে, কিন্তু হঠাৎ কী এমন ঘটেছে যে ভেঙে গেল অর্ণব ও ইপ্সিতার সম্পর্ক? সামাজিক বিয়ের আগেই দম্পতিকে বিচ্ছেদের পথে হাঁটতে বাধ্য করেছিল কোন অজানা কারণ? এতদিন পর প্রকাশ্যে এল সেই তথ্য!
অঞ্জনের কথায় তাঁর দাম্পত্য জীবনের যে ছবিটি সামনে আসে, তা নিখুঁত সম্পর্কের নয়, বরং ভুল, অভিমান, দায়িত্ববোধ এবং আবার একে অপরের কাছে ফিরে আসার গল্প। তিনি মনে করেন, জীবনে সবসময় সবকিছু নিজের মতো করে পাওয়া যায় না, কিন্তু সম্পর্ককে গুরুত্ব দিলে সমস্যার মধ্যেও সমাধানের পথ খুঁজে নেওয়া সম্ভব। নতুন ছবি ‘দেরি হয়ে গেছে’-এর গল্পেও যেমন ভুল বোঝাবুঝির পর ‘সরি’ বলার প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে, তেমনই তাঁর নিজের জীবনেও সেই কথার বাস্তব প্রতিফলন রয়েছে। তাই অঞ্জনের কাছে ভালোবাসা শুধু অনুভূতি নয়, প্রয়োজনের সময়ে পাশে দাঁড়ানো এবং সম্পর্কটাকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্বও।






