স্বামীকে হারানোর যন্ত্রণা সামলাতে না সামলাতেই সরকারি নথি পাওয়ার জন্য দিনের পর দিন দফতরের দরজায় ঘুরতে হচ্ছে চন্দ্রকোণার বিধবা রীতা আরিকে। পশ্চিম মেদিনীপুরের চন্দ্রকোণার রাঙামাটি গ্রামের বাসিন্দা রীতা আরি। গত ১১ মার্চ ২০২৬ তাঁর স্বামী রাখাল আরির মৃত্যু হয়। পেশায় আলু চাষি রাখাল ঋণের বোঝা সামলাতে না পেরে কীটনাশক খেয়ে আত্মহত্যা করেন বলে জানানো হয়েছে। স্বামীর মৃত্যুর পর অসুস্থ শাশুড়ি এবং দুই নাবালক ছেলের দায়িত্ব এসে পড়েছে রীতার কাঁধে। এর মধ্যেই স্বামীর মৃত্যু সনদ না পাওয়ায় আরও বড় সমস্যার মুখে পড়েছেন তিনি। মৃত্যু সনদ হাতে না থাকায় বিধবা ভাতা-সহ বিভিন্ন সরকারি সুবিধা পাওয়ার প্রক্রিয়াও আটকে রয়েছে।
রীতার দাবি, গত কয়েক মাস ধরে স্বামীর ডেথ সার্টিফিকেটের জন্য সরকারি দফতরে ঘুরছেন তিনি। কিন্তু এখনও সেই গুরুত্বপূর্ণ নথি হাতে পাননি। এদিকে স্বামীর নেওয়া ঋণের কিস্তি হিসেবে প্রতি মাসে ৭ হাজার টাকা করে দিতে হচ্ছে তাঁকে। সংসারে আয় বলতে কার্যত কিছুই নেই, তাই বাড়ির গৃহপালিত পশু বিক্রি করেও গত তিন মাস ধরে ঋণ শোধ করছেন তিনি। এই অসহায়তার কথাই সম্প্রতি ‘লাখ টাকার লক্ষ্মী লাভ’ রিয়্যালিটি শোয়ের মঞ্চে অভিনেত্রী সুদীপ্তা চক্রবর্তীর সামনে তুলে ধরেন রীতা। স্বামীর ছবি হাতে নিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। আবেগতাড়িত রীতা বলেন, “পায়ের চটি ছিঁড়ে গেলেও স্বামীর ডেথ সার্টিফিকেট হাতে পাচ্ছি না।”
রীতার এই পরিস্থিতির কথা জানতে পেরে তাঁর পাশে দাঁড়ান অভিনেত্রী সুদীপ্তা চক্রবর্তী। বিষয়টি ঘাটালের সাংসদ তথা অভিনেতা দেবের নজরেও আনেন তিনি। সুদীপ্তা সরাসরি নিজের ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে দেবের কাছে সাহায্যের আবেদন জানান। তিনি লেখেন, “কিছু ব্যবস্থা যদি করা যায়, ওর অনেক উপকার হয়। দেব, তুমি কি পারবে তোমার টিমকে একটু এই বিষয়টা দেখতে?” অভিনেত্রীর এই আবেদনের জবাবও দ্রুত দেন দেব। তিনি জানান, “কালকে জানাচ্ছি দি।” ঘাটালের সাংসদ এবং তাঁর টিম বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দেওয়ায় রীতার ডেথ সার্টিফিকেট পাওয়ার জটিলতা এবার কাটতে পারে বলে আশা তৈরি হয়েছে।
তবে সুদীপ্তার মতে, একজন রীতার সমস্যার সমাধান হলেই সমস্যার শেষ নয়। গ্রামবাংলায় এমন আরও বহু কৃষক পরিবার রয়েছে, যাদের জীবন ঋণ, ফসলের দাম এবং প্রশাসনিক সমস্যার চাপে বিপর্যস্ত। রীতার পরিস্থিতির প্রসঙ্গেই আলুর দাম নিয়ে প্রশ্ন তোলেন অভিনেত্রী। তিনি বলেন, “৯০০ টাকা কুইন্টাল আলু বিক্রি হত, সেখানে ১০০ টাকা কুইন্টাল বিকোচ্ছে।” এরপরই তিনি প্রশ্ন করেন, “কারা এই দাম নির্ধারণ করছে?” সুদীপ্তার বক্তব্য, নিজেদের সুবিধামতো ফসলের দাম বাড়ানো-কমানোর ফলে কৃষকরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছেন। এই পরিস্থিতিতে কৃষকের জীবন যে কতটা কঠিন হয়ে উঠছে, রাখাল আরির মৃত্যু তারই একটি বেদনাদায়ক উদাহরণ বলে তিনি জানান।
রীতার সঙ্গে কথা বলার সময় তাঁকে মানসিকভাবে শক্ত থাকার বার্তাও দেন সুদীপ্তা। দুই সন্তান এবং অসুস্থ শাশুড়িকে নিয়ে এখন তাঁকেই সংসারের হাল ধরতে হবে বলে মনে করিয়ে দেন অভিনেত্রী। রীতার পাশে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, “তুমি ভেঙে পড়লে চলবে না, ওদের মুখের দিকে তাকিয়ে তোমাকে শক্ত থাকতে হবে।” এরপর রীতার দায়িত্বের কথা বোঝাতে সুদীপ্তা আরও বলেন, “তুই এই চারজনের টিমের লিডার।” স্বামীকে হারিয়ে রীতা যে পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন, সেখানে তাঁর লড়াই সহজ নয়। তার উপর ঋণের কিস্তি, সন্তানদের ভবিষ্যৎ এবং সরকারি নথি পাওয়ার সমস্যা সবকিছুই একসঙ্গে সামলাতে হচ্ছে তাঁকে। দেবের টিম বিষয়টি দেখার আশ্বাস দেওয়ায় অন্তত ডেথ সার্টিফিকেট পাওয়ার ক্ষেত্রে এবার কিছুটা আশার আলো দেখা দিয়েছে।
আরও পড়ুনঃ ২৬ বছরের সংসারে শ্বশুরবাড়ির ভালোবাসায় ভরপুর ইন্দ্রানী হালদার! ৬ ননদের ঘরে তিনিই ছোট বৌদি, তাঁকে আদর করে কী নামে ডাকেন সকলে? কেমন সম্পর্ক স্বামী ভাস্করের সঙ্গে? নেই সন্তান, শারীরিক অসু’স্থতা থেকে অব’সাদে ভুগতে শুরু করেন! জীবনের নানান কঠিন সময় কীভাবে পাশে পেয়েছেন তাদের?
রাখাল আরির মৃত্যুর পর রীতার পরিবারের আর্থিক সংকট আরও গভীর হয়েছে। স্বামীর মৃত্যু সনদ না থাকায় সরকারি সাহায্য পাওয়ার পথও সহজ হচ্ছে না। ফলে যে পরিবারে প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করাই বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানে মাসিক ঋণের কিস্তি আরও বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুদীপ্তার উদ্যোগে এবার প্রশাসনিক স্তরে বিষয়টি গুরুত্ব পায় কি না, সেদিকেই নজর রয়েছে। একজন অসহায় বিধবার সমস্যার সমাধান হলেও একই পরিস্থিতিতে থাকা অন্য কৃষক পরিবারগুলির সমস্যাও সামনে আসছে। আলুর ন্যায্য দাম, কৃষকদের ঋণের চাপ এবং সরকারি পরিষেবা পেতে হয়রানি, সব মিলিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। রীতার মতো পরিবারগুলির পাশে প্রশাসন এবং জনপ্রতিনিধিরা কতটা দ্রুত দাঁড়াতে পারেন, এখন সেটাই দেখার।






