বাংলা ছবিতে খলনায়িকা হোক কিংবা দাপুটে ‘বিন্দু মাসি’, অনামিকা সাহার অভিনয় দর্শকের মনে আলাদা জায়গা করে নিয়েছে। দীর্ঘ অভিনয় জীবনে একাধিক ধরনের চরিত্রে তাঁকে দেখা গেলেও তাঁর নিজের জীবনে ছিল একটি বিশেষ অপূর্ণ ইচ্ছে। মহানায়ক উত্তম কুমারের সঙ্গে অভিনয় করার সুযোগ পেয়েও তাঁর বুকে মাথা রেখে অভিনয় করার সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। বহু বছর পর সেই অপূর্ণতার সঙ্গে জড়িয়ে যায় আর এক কিংবদন্তি অভিনেতার নাম। তিনি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। এক সাক্ষাৎকারে সেই পুরনো দিনের স্মৃতি ভাগ করে নিয়েছিলেন অনামিকা সাহা। কীভাবে উত্তম কুমারকে ঘিরে তাঁর সেই আক্ষেপ অন্যভাবে পূরণ হয়েছিল, সেই ঘটনাই উঠে এসেছে তাঁর কথায়।
বহু বছর আগে পরিচালক গৌতম চৌধুরী তরুণী অনামিকা সাহাকে উত্তম কুমারের সঙ্গে একটি ছবিতে অভিনয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। প্রস্তাব পেয়েই আনন্দে রীতিমতো রোমাঞ্চিত হয়ে উঠেছিলেন অভিনেত্রী। শুটিংয়ের দিন ইন্দ্রপুরী স্টুডিওতে মহানায়ককে সামনে দেখে তাঁর উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। উত্তম কুমারের নিজের ঘর এবং তাঁর উপস্থিতির প্রভাব এতটাই ছিল যে অনামিকা পর্যন্ত কেঁপে উঠেছিলেন। দৃশ্য অনুযায়ী, মন্টু ব্যানার্জির হাত থেকে অসুস্থ বাঈজি চরিত্রের অনামিকাকে বাঁচাতে সেটে প্রবেশ করার কথা ছিল উত্তম কুমারের। পরিচালক তাঁকে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছিলেন, দৃশ্যের সময় কোনওভাবেই চোখ খোলা যাবে না।
কিন্তু মহানায়ক যখন কাছে এসে তাঁকে বলেছিলেন, “জবা চোখ খোলো…”, তখন সেই মুহূর্তে নিজেকে সামলাতে পারেননি অনামিকা। পরিচালকের নির্দেশের কথা ভুলে এক ঝলক উত্তম কুমারকে দেখার লোভ সামলাতে পারেননি তিনি। কিন্তু সেই ছবির কাজ আর সম্পূর্ণ হয়নি। পরের দফার শুটিংয়ের আগেই অন্য ছবির ব্যস্ততা এবং উত্তম কুমারের শারীরিক অসুস্থতার কারণে কাজ আটকে যায়। কিছুদিন পরেই আসে মহানায়কের প্রয়াণের খবর। শ্মশানে গিয়ে তাঁর নিথর দেহের দিকে তাকিয়ে কেবল কেঁদেছিলেন অনামিকা। তাঁর মনে হয়েছিল, উত্তম কুমারের বুকে মাথা রেখে অভিনয় করার যে স্বপ্ন ছিল, তা আর কোনও দিন পূরণ হবে না।
এরপর বিবাহিত জীবন শুরু করেন অনামিকা এবং পরে সন্তানের মা হন। সেই সময় অনুপ সেনগুপ্ত পরিচালিত ‘পাপপুণ্য’ ছবিতে অভিনয়ের প্রস্তাব আসে তাঁর কাছে। ছবিতে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের স্ত্রীর চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান তিনি। এই ছবিতে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় এবং পল্লবী চট্টোপাধ্যায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ছিলেন। পরিচালক অনুপ সেনগুপ্তের কাছে অনামিকার একটি বিশেষ অনুরোধ ছিল। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর জড়িয়ে ধরার দৃশ্যটি যেন শুটিংয়ের শুরুতেই নেওয়া হয়। অবশেষে এনটিওয়ান স্টুডিওতে সেই দৃশ্যের দিন আসে। ধুতি পাঞ্জাবি পরা সৌমিত্রকে সামনে দেখেই যেন বহু পুরনো অনুভূতি আবার ফিরে আসে অভিনেত্রীর মনে।
আরও পড়ুনঃ একটুর জন্য বেঁচে গিয়েছে দৃষ্টিশক্তি! র*ক্ত জমাট বেঁধে ফুলে গিয়েছে চোখ, শুটিং করতে গিয়ে ভয়ঙ্ক’র চোট পেলেন আরাত্রিকা মাইতি! উদ্বিগ্ন অনুরাগীরা, এখন কেমন আছেন প্রিয় অভিনেত্রী?
চিত্রনাট্য অনুযায়ী শুটিং শুরু হতেই সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেন অনামিকা সাহা। কিন্তু পরিচালক ‘কাট’ বলার পরেও তাঁকে ছাড়েননি অভিনেত্রী। দৃশ্য শেষ হয়ে গেলেও সৌমিত্রকে জড়িয়ে ধরেই দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। সেই মুহূর্তে তাঁর মনে হয়েছিল, উত্তম কুমারকে তো পাননি, কিন্তু সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে পেয়েছেন। অনামিকা জানিয়েছিলেন, যে বুকে একদিন সন্ধ্যা রায় এবং সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের মতো অভিনেত্রীরা মাথা রেখেছেন, সেই সৌমিত্রের বুকেই সেদিন তাঁকে জড়িয়ে ধরার সুযোগ মিলেছিল। তাঁর কথায়, উত্তম কুমারকে না পাওয়ার দীর্ঘ আক্ষেপ যেন সেই মুহূর্তে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে জড়িয়ে ধরার মধ্য দিয়েই কিছুটা পূর্ণ হয়েছিল।






