বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের নাম এক উজ্জ্বল অধ্যায়। দীর্ঘ ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে অভিনয়, সিনেমা, থিয়েটার, যাত্রা, রেডিও এবং লাইভ শো বিনোদনের প্রায় প্রতিটি মাধ্যমেই নিজের ছাপ রেখেছেন এই প্রবীণ অভিনেতা। বয়সের ভার তাঁর কাজের গতি থামাতে পারেনি, বরং এখনও নতুন স্বপ্ন নিয়ে ছুটে চলেছেন তিনি। এক সাক্ষাৎকারে বিশ্বজিৎ জানান, তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি কোনও পুরস্কার নয়, মানুষের ভালোবাসা। সেই ভালোবাসার টানেই এখনও কাজ করে যেতে চান তিনি এবং নিজের দেশের মানুষের জন্য কিছু করার স্বপ্নও দেখেন।
ব্যক্তিগত জীবনেও কম ওঠাপড়া দেখেননি বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়। তাঁর প্রথম স্ত্রী ছিলেন প্রয়াত রত্না চট্টোপাধ্যায়। তাঁদের সংসারে জন্ম দুই সন্তান অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় এবং অভিনেত্রী পল্লবী চট্টোপাধ্যায়। পরবর্তীতে প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর মুম্বইয়ে গিয়ে ইরা চট্টোপাধ্যায়কে বিয়ে করেন বিশ্বজিৎ। ইরা মঞ্চনাটকের সঙ্গে যুক্ত এবং তাঁদের একমাত্র মেয়ে প্রাইমা চট্টোপাধ্যায়। অর্থাৎ দুই সংসার মিলিয়ে বিশ্বজিতের তিন সন্তান। দীর্ঘ সময় পারিবারিক দূরত্ব থাকলেও পরবর্তীতে ছেলে প্রসেনজিৎ, পুত্রবধূ অর্পিতা এবং নাতি ত্রিশাঞ্জিতের উদ্যোগে সম্পর্কের সমীকরণে বদল আসে।
সাক্ষাৎকারে ছেলেকে নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আবেগঘন হয়ে পড়েন বিশ্বজিৎ। তাঁর কথায়, প্রসেনজিতের সুপারস্টার হয়ে ওঠার পিছনে বাবার পরিচয়ের চেয়ে তাঁর নিজের পরিশ্রমই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ছোট বয়সেই অভিনয়ে পা রাখলেও নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার সময় নিজের লড়াই নিজেকেই করতে হয়েছে বলে জানান তিনি। এমনকি মুম্বইয়ে গিয়ে কাজ করার সুযোগের কথাও উঠেছিল। কিন্তু প্রসেনজিৎ তাঁকে স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, ‘এই বাংলা আমাকে প্রসেনজিৎ বানিয়েছে, ওরা আমাকে এত ভালোবাসে, আমি এই ইন্ডাস্ট্রি ছেড়ে আসব না।’ ছেলের এই সিদ্ধান্ত ও নিজের জায়গার প্রতি দায়বদ্ধতাকে আজও সম্মান করেন বিশ্বজিৎ।
অন্যদিকে প্রাইমাও বাবার কাছ থেকে শেখা কাজের প্রতি ভালোবাসা ও নিষ্ঠার কথা তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে, বিশ্বজিৎ ব্যস্ততার মধ্যেও পরিবারের খোঁজ রাখেন এবং প্রয়োজন হলে সন্তানদের বকাঝকাও করেন। একইসঙ্গে প্রসেনজিৎ ও বিশ্বজিতের পারিবারিক সম্পর্কের পিছনে অর্পিতার ভূমিকার কথাও সামনে আসে। সাক্ষাৎকারে পরিবার সূত্রে জানানো হয়, প্রসেনজিতের স্ত্রী অর্পিতা এবং ছেলে তৃষানজিতের উদ্যোগেই দূরত্ব কমিয়ে বাবার সঙ্গে যোগাযোগ আরও ঘনিষ্ঠ হয়। ফলে একসময় যে সম্পর্কে দূরত্ব ছিল, সেখানে ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে নতুন পারিবারিক বন্ধন।
আরও পড়ুনঃ কব্জি ডুবিয়ে মা’ছ-মাং’স খাবে কি বাঙালি? দুর্গাপুজোয় বাঙালির পাতে আমিষ না নিরামিষ? বাগেশ্বর বাবার ‘পাখ*ণ্ডী’ নিদান উড়িয়ে লকেট চট্টোপাধ্যায়ের সাফ কথা, “এই চার-পাঁচ দিনের জন্য সবাই…”
সব মিলিয়ে এই সাক্ষাৎকারে শুধু একজন কিংবদন্তি অভিনেতার দীর্ঘ অভিনয়জীবনের গল্প নয়, সামনে এসেছে বাবা-ছেলের সম্পর্কের এক অন্যরকম অধ্যায়ও। বিশ্বজিতের চোখে প্রসেনজিৎ শুধু তাঁর সন্তান নন, নিজের লড়াইয়ে তৈরি হওয়া একজন সফল অভিনেতা। আর প্রাইমার কথায় স্পষ্ট, তাঁদের পরিবারে এখনও বাবার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা রয়েছে। সময়, দূরত্ব এবং ব্যস্ততার বহু বাধা পেরিয়ে পরিবারের সদস্যদের ফের কাছাকাছি আসার এই গল্পই সাক্ষাৎকারের অন্যতম আবেগঘন দিক হয়ে উঠেছে।






