বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে মহানায়িকা সুচিত্রা সেন এমন এক নাম, যাঁর অভিনয়, ব্যক্তিত্ব এবং পর্দায় উপস্থিতি আজও দর্শকদের মুগ্ধ করে। উত্তম কুমারের সঙ্গে তাঁর জুটি বাংলা সিনেমায় তৈরি করেছিল এক স্বর্ণযুগ। রোমান্টিক ছবি থেকে শুরু করে ভিন্ন স্বাদের চরিত্র, নানা ধরনের অভিনয়ে নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তুলেছিলেন তিনি। শুধু বাঙালি দর্শকই নন, তাঁর অভিনয়ের আকর্ষণ ছড়িয়ে পড়েছিল বাংলা সিনেমার গণ্ডি পেরিয়েও। কিন্তু এত দীর্ঘ এবং বর্ণময় অভিনয়জীবন সত্ত্বেও বাংলা চলচ্চিত্রের আর এক কিংবদন্তি পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের কোনও ছবিতে দেখা যায়নি সুচিত্রা সেনকে। কেন দুই কিংবদন্তির একসঙ্গে কাজ করা হয়ে ওঠেনি, তা নিয়ে আজও কৌতূহল রয়েছে সিনেমাপ্রেমীদের মনে।
সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় কাজ করার সুযোগ পেলে সুচিত্রা সেনের অভিনয়জীবনে যে এক নতুন অধ্যায় তৈরি হতে পারত, তা নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। অন্যদিকে, সত্যজিৎ রায়ের ছবিতে অভিনয় করা বহু অভিনেতা-অভিনেত্রী তাঁদের কাজের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পেয়েছেন। ফলে বাংলা সিনেমার দুই উজ্জ্বল নক্ষত্রকে একসঙ্গে পর্দায় দেখার আকাঙ্ক্ষা ছিল দর্শকদের। তবে তাঁদের মধ্যে কোনও কাজের সূত্রে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি বলে জানিয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়ের স্ত্রী বিজয়া রায়। তাঁর স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে, চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানের মতো কয়েকটি জায়গায় সুচিত্রা সেনের সঙ্গে তাঁদের দেখা হতো। কিন্তু সেই পরিচয় ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা বা একসঙ্গে কাজ করার পর্যায়ে পৌঁছয়নি।
তবে সুচিত্রা সেনকে নিয়ে সত্যজিৎ রায়ের কোনও ভাবনাই ছিল না, বিষয়টি তেমন নয়। বিজয়া রায়ের বক্তব্য অনুযায়ী, সুচিত্রার ব্যক্তিত্ব এবং পর্দায় তাঁর উপস্থিতি ছিল অসাধারণ। তাঁর মধ্যে এমন এক আকর্ষণ ছিল, যা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল। সত্যজিৎ রায়ের বাড়িতেও সুচিত্রা সেনকে নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। বিশেষ করে ‘ঘরে বাইরে’ ছবির বিমলা চরিত্রের জন্য একসময় সুচিত্রা সেনের কথা ভাবা হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি এই ছবিতে বিমলার চরিত্রটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুচিত্রা সেন সেই চরিত্রে অভিনয় করলে তা নিঃসন্দেহে বাংলা সিনেমার ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন হতে পারত। কিন্তু সেই ভাবনা বেশিদূর এগোয়নি। শেষ পর্যন্ত ছবিতে অভিনয় করা হয়নি তাঁর।
এরপর সত্যজিৎ রায়ের ‘দেবী চৌধুরানী’ ছবির পরিকল্পনাকে ঘিরেও সুচিত্রা সেনকে নিয়ে আলোচনা হয়েছিল বলে জানান বিজয়া রায়। এই ছবিটি তৈরির উদ্যোগ একসময় বেশ কিছুটা এগিয়েছিল। প্রযোজনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ছায়াবাণীর অসিত চৌধুরীও। অর্থাৎ, বিষয়টি শুধুমাত্র প্রাথমিক ভাবনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; ছবিটি বাস্তবায়িত করার জন্য কিছুটা প্রস্তুতিও হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নানা জটিলতা সামনে আসে। তার মধ্যে অন্যতম ছিল শিল্পীর সময় বা ডেটের সমস্যা। পাশাপাশি, বাজেট নিয়েও চিন্তা ছিল। সেই সময়ের বিচারে ছবিটি তৈরি করার খরচও ছিল যথেষ্ট বড় বিষয়। সব মিলিয়ে পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করা সম্ভব হয়নি। বিজয়া রায়ের কথায়, ছবিটি তৈরি হলে তা দারুণ হতে পারত।
আরও পড়ুনঃ “একসঙ্গে থাকা মানুষগুলোর সিদ্ধান্তেই বেরিয়ে গেলাম, দর্শকের ভোটে হলে এতটা খারাপ লাগত না” “ভেজানো চিড়ে খেয়েই থাকতে হয়েছে আমায়, অন্যদের মতো না ছিল লাগেজ, না প্রস্তুতি” কমেছে ৮ থেকে ৯ কেজি ওজনও! বিগ বস বাংলার ৪০ দিনের অভিজ্ঞতা নিয়ে মুখ খুললেন দীপেন্দু বিশ্বাস! খাবারের সংকট থেকে আচমকা এলিমিনেশন নিয়েই অকপট প্রাক্তন ফুটবলার কী বললেন?
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, সুচিত্রা সেন ও সত্যজিৎ রায়ের একসঙ্গে কাজ না করার পিছনে কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তিগত বিরোধের কথা বিজয়া রায়ের এই স্মৃতিচারণে উঠে আসেনি। বরং ‘ঘরে বাইরে’ এবং ‘দেবী চৌধুরানী’ দুটি ছবিকে ঘিরে সম্ভাবনা তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবের মুখ দেখেনি। একদিকে সুচিত্রা সেনের অসাধারণ পর্দা-ব্যক্তিত্ব, অন্যদিকে সত্যজিৎ রায়ের অনন্য চলচ্চিত্র নির্মাণের দৃষ্টিভঙ্গি এই দুইয়ের মেলবন্ধন ঘটলে বাংলা সিনেমা পেত এক স্মরণীয় অধ্যায়। কিন্তু নানা পরিস্থিতির কারণে সেই সম্ভাবনা অপূর্ণই থেকে যায়। আর সেই কারণেই আজও বাংলা চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মনে প্রশ্ন জাগে, সত্যজিৎ রায়ের ছবিতে সুচিত্রা সেন অভিনয় করলে সেই সিনেমার ইতিহাস কি অন্য রকম হতে পারত?






