দুর্গাপুজো মানেই বাঙালির কাছে আনন্দ, নতুন জামাকাপড়, পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে ঠাকুর দেখা আর একরাশ ছোটবেলার স্মৃতি। কিন্তু অভিনেতা বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের কাছে দুর্গাপুজোর স্মৃতিতে যেমন আনন্দ রয়েছে, তেমনই জড়িয়ে রয়েছে গভীর কষ্ট। মাত্র ১৩ বছর বয়সে পুজোর সময়েই মাকে হারিয়েছিলেন তিনি। সেই শূন্যতা আজও পূরণ হয়নি তাঁর জীবনে। ছোটবেলায় পুজোর জন্য নতুন জামাকাপড় কেনা হত, আর কোন দিন কোন পোশাক পরবেন, তা আগে থেকেই ঠিক করে রাখতেন তিনি। ষষ্ঠী, সপ্তমী কিংবা অষ্টমীতে কী পরবেন, সেই পরিকল্পনা নিয়ে চলত তাঁর ছোটবেলা। নতুন জামাকাপড়ের গন্ধ, মা-বাবার হাত ধরে মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে ঠাকুর দেখা, সব মিলিয়ে পুজো ছিল তাঁর কাছে আনন্দের উৎসব। এমনকি রাতে ঘুমোতে যাওয়ার সময়েও নতুন জামাকাপড় মাথার কাছে রেখে শুতেন তিনি।
কিন্তু মাত্র ১৩ বছর বয়সে দুর্গাপুজোর সময়েই জীবনের সবচেয়ে বড় আঘাত পান বিশ্বজিৎ। পুজোর ঠিক আগে তাঁর মা প্রয়াত হন। ছোট্ট বয়সে মাকে হারানোর সেই যন্ত্রণা আজও ভুলতে পারেননি অভিনেতা। মায়ের মৃত্যুর পর বাবা তাঁকে দিয়েই সমস্ত পারলৌকিক কাজ করিয়েছিলেন। পুজোর মধ্যেই মায়ের শ্রাদ্ধশান্তির কাজ সম্পন্ন করতে হয়েছিল তাঁকে। যে সময়ে অন্য শিশুরা নতুন জামাকাপড় পরে আনন্দে মেতে ওঠে, সেই সময়েই বিশ্বজিৎকে মেনে নিতে হয়েছিল মাকে হারানোর কঠিন সত্য। তাঁর মাসিমা সেই সময়ে তাঁকে বুকে টেনে নিয়ে আগলে রেখেছিলেন। তবুও মায়ের চলে যাওয়ার ফলে তৈরি হওয়া শূন্যতা আর কখনও পূরণ হয়নি। দুর্গাপুজোর কথা উঠলেই তাই আজও অভিনেতার মনে ভিড় করে মায়ের স্মৃতি। আনন্দের পাশাপাশি সেই পুরনো কষ্টও তাঁর পুজোর স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।
মাকে হারানোর পর বিশ্বজিতের কষ্ট বুঝতে পেরেছিলেন তাঁর বড়মামাও। অভিনেতার স্মৃতিতে, তাঁর বড়মামা মাকে ভীষণ ভালবাসতেন। ভাগ্নে যাতে পুজোর সময় নতুন জামাকাপড় না পেয়ে আরও কষ্ট না পান, সেই কথা ভেবে তিনি নিজের ছেলেমেয়েদের জন্যও নতুন পোশাক কেনেননি। ছোটবেলার সেই ঘটনা আজও বিশ্বজিতের মনে গভীরভাবে রয়ে গিয়েছে। বর্তমানে দীর্ঘ সময় ধরে মুম্বইয়ে থাকলেও দুর্গাপুজোর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক একটুও কমেনি। গত ২৪ বছর ধরে নিজের বাড়িতে দুর্গাপুজোর আয়োজন করছেন অভিনেতা। স্ত্রী ইরা চট্টোপাধ্যায়কে সঙ্গে নিয়ে মুম্বইয়ে শুরু করেছিলেন এই পুজো। প্রথম দিকে খুব সাধারণভাবে আয়োজন শুরু হলেও ধীরে ধীরে অনেক মানুষ তাঁদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। এখন সেই পুজো পরিচিতি পেয়েছে ‘বিশ্বজিতের পুজো’ নামে। বহু মানুষ সেখানে ঠাকুর দেখতে আসেন, অভিনেতার সঙ্গে দেখা করেন এবং তাঁর আয়োজনের প্রশংসা করেন।
বিশ্বজিতের পুজোয় শুধু মুম্বই নয়, মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেও মানুষ আসেন। কলকাতা থেকেও অনেকে পুজো দেখতে যান। ঠাণে, নাসিকের মতো জায়গা থেকেও দর্শনার্থীরা হাজির হন। তাঁদের ভালোবাসা এবং উপস্থিতি অভিনেতাকে আনন্দ দেয়। তাঁর পুজোর প্রতিমা আগে তৈরি করতেন শিল্পী নিমাই পাল। তাঁর মৃত্যুর পর সেই দায়িত্ব সামলাচ্ছেন তাঁর ছেলে অমিত পাল। মুম্বই ও পুণের বহু প্রতিমাও তাঁর হাতেই তৈরি হয়। পুজোর ঢাকি নিয়ে আসা হয় কলকাতা থেকে। ভোগ রান্নার দায়িত্বেও থাকেন কলকাতার মানুষ। অর্থাৎ মুম্বইয়ে থেকেও বাঙালির চেনা পুজোর পরিবেশ ধরে রাখার চেষ্টা করেন বিশ্বজিৎ। তাঁর কাছে এই আয়োজন শুধুই উৎসব নয়, বরং নিজের শিকড় এবং বাঙালিয়ানার সঙ্গে যুক্ত থাকার একটি উপায়। পুজোর প্রতিটি আয়োজনে তাই পুরনো দিনের স্মৃতি এবং নিজের সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা ফুটে ওঠে।
পুজোর আয়োজনের ক্ষেত্রে বিশ্বজিৎ এখনও সাবেকি রীতিকেই গুরুত্ব দেন। তাঁর পুজোয় একচালার প্রতিমাই বিশেষ জায়গা জুড়ে রয়েছে। এই ধরনের প্রতিমা দেখলেই তাঁর মনে হয়, পুজো যেন ঠিক নিজের মনের মতো হচ্ছে। তাঁর মতে, ভক্তি, শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা, এই তিনটি বিষয়ই দুর্গাপুজোর মূল কথা। তাই পুজোয় অতিরিক্ত আড়ম্বরের বদলে ভক্তদের জন্য ভালোভাবে ভোগের ব্যবস্থা করার দিকে বেশি নজর দেন তিনি। মণ্ডপে সারাক্ষণ বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চণ্ডীপাঠ শোনানো হয়। পাশাপাশি চলে সলিল চৌধুরী, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, শচীন দেববর্মন এবং সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গান। বাঙালির চেনা সংস্কৃতি এবং পুজোর পুরনো আমেজ ধরে রাখতেই এই আয়োজন। ঝালমুড়ি ও ফুচকার স্টলও থাকে পুজো প্রাঙ্গণে, যা দর্শনার্থীদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। সব মিলিয়ে আধুনিক শহর মুম্বইয়ের মধ্যেও বাঙালির ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপুজোর পরিবেশ বজায় রাখতে চান অভিনেতা।
আরও পড়ুনঃ “সেদিন কম বার চায়নি রে, ওর মতো কেউ চায়নি চার্জ এতবার, আজ আমার অনুশোচনা হয়…” নিজের মুখেই সত্যি স্বীকার দুর্নিবারের! ‘ওঁর মানসিকতাই খারাপ সবাইকে সন্দেহ করে’ এতদিন জিতুকেই ভুল বুঝেছেন দর্শক, হাসাহাসিও হয়নি কম! ভিডিও ফাঁস হতেই কি তবে মিলে গেল জিতুর দেওয়া ‘মাইন্ড গেম মাস্টার’ তকমা? সৃজলাকে প্রেমের স্বীকারোক্তিও তাঁর কোনও কৌশল?
এ বছরের পুজো নিয়েও বিশ্বজিতের পরিবারে বিশেষ পরিকল্পনা রয়েছে। স্ত্রী ইরা এবং মেয়ে সম্ভবীর ইচ্ছায় এ বার তাঁদের বাড়িতে আসবে সোনারঙের প্রতিমা, যার নেপথ্যে থাকবে রুপোর সাজ। অর্থাৎ এ বারের দুর্গাপুজোয় সোনা ও রুপোর সাজে সজ্জিত হবেন দেবী দুর্গা। পুজো উপলক্ষে নানা অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হবে। তবে এই আনন্দের মধ্যেও মাকে হারানোর স্মৃতি অভিনেতার মনে থেকে গিয়েছে। আগামী বছর তাঁদের পুজোর রজতজয়ন্তী, অর্থাৎ ২৫ বছর পূর্ণ হবে। সেই বিশেষ বছরেও আরও সুন্দরভাবে পুজোর আয়োজন করার ইচ্ছা রয়েছে তাঁর। সবটাই অবশ্য দেবীর ইচ্ছার উপর ছেড়ে দিয়েছেন বিশ্বজিৎ। ছোটবেলায় যে পুজো ছিল মা-বাবার হাত ধরে আনন্দ করার সময়, আজ সেই পুজোই তাঁর কাছে নিজের মাকে স্মরণ করারও উপলক্ষ। মুম্বইয়ে বছরের পর বছর দুর্গাপুজোর আয়োজন করলেও নিজের মাকে কাছে না পাওয়ার কষ্ট আজও রয়ে গিয়েছে তাঁর মনে।






