বাঙালির কাছে দুর্গাপুজো মানেই আনন্দ, আড্ডা, নতুন জামাকাপড় আর পরিবারের সঙ্গে কাটানো কিছু বিশেষ মুহূর্ত। সময়ের সঙ্গে উৎসব উদযাপনের ধরন বদলালেও ছোটবেলার পুজোর স্মৃতি আজও অনেকের মনে উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে। সেই পুরনো দিনের কথাই ফিরে দেখলেন জনপ্রিয় বাচিকশিল্পী ব্রততী বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর কাছে শারদোৎসব মানে শুধু চারটে দিন আনন্দ করা নয়, বরং শৈশবের নানা মুহূর্তকে নতুন করে ফিরে পাওয়া। পুজোর কথা উঠলেই মনে পড়ে যায় বাবা-মায়ের সঙ্গে কাটানো সময়, পরিবারের সদস্যদের ব্যস্ততা এবং পাড়ার মানুষের সঙ্গে মিশে থাকার দিনগুলি। মহালয়ার ভোরে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ শুনতে শুনতেই তাঁর মনে পড়ে যায় বাবা-মায়ের কথা। তাঁদের স্মৃতি এবং ছোটবেলার নানা অভিজ্ঞতা মিলিয়েই ব্রততীর কাছে দুর্গাপুজো আজও বিশেষ আবেগের নাম।
ছোটবেলায় পুজোর প্রস্তুতি শুরু হয়ে যেত অনেক আগে থেকেই। ব্রততী জানিয়েছেন, পুজোর আগে তাঁর বাবা-মায়ের মধ্যে পরিবারের সদস্যদের পছন্দ-অপছন্দ নিয়ে আলোচনা চলত। কাকা, মাসি, পিসি থেকে শুরু করে তাঁদের ছেলেমেয়েদের জন্য কী কেনা হবে, সেই তালিকাও তৈরি করা হতো। পরিবারের সকলের পছন্দের কথা মাথায় রাখা হলেও ঠাকুমা ও ঠাকুরদার জন্য থাকত বিশেষ গুরুত্ব। ছোট্ট ব্রততীর কাছেও পুজোর উপহার ছিল বাড়তি আনন্দের বিষয়। পুজোর প্রথম উপহার হিসেবে ছোট মামার কাছ থেকে নতুন ফ্রক পেতেন তিনি। সেই সময়ের পারিবারিক ব্যস্ততা, কেনাকাটার পরিকল্পনা এবং উপহার পাওয়ার আনন্দ আজও তাঁর স্মৃতিতে রয়ে গিয়েছে। পরিবারের সকলকে নিয়ে পুজোর প্রস্তুতির সেই দিনগুলিই তাঁর কাছে শৈশবের দুর্গোৎসবকে আরও সুন্দর করে তুলেছিল।
পুজোর ছুটিতে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা না হওয়ার আক্ষেপও ছিল ছোটবেলায়। স্কুল বন্ধ থাকায় অনেক বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ রাখা সম্ভব হতো না। সেই সময় যদি মোবাইল ফোন থাকত, তাহলে হয়তো বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগের অভাব এতটা অনুভব করতে হতো না বলেই মনে করেন ব্রততী। তবে পুজোর দিনগুলিতে তিনি শুধু ঘুরে বেড়িয়েই সময় কাটাতেন না, পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও অংশ নিতেন। ব্রততী, তাঁর ভাই, বাবা ও মা, প্রত্যেকেই কোনও না কোনও অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকতেন। পঞ্চমী থেকে নবমী পর্যন্ত টানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ব্যস্ততা চলত। এই ক’দিন পাড়া ছেড়ে অন্য কোথাও যাওয়ার কথা ভাবতেন না তাঁরা। পুজোর আনন্দের সঙ্গে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের এই যোগ তাঁর ছোটবেলার দিনগুলিকে আরও স্মরণীয় করে রেখেছে। আজও সেই সময়ের কথা মনে পড়লে ফিরে আসে পুরনো দিনের নানা ছবি।
নবমীর রাত এলেই অবশ্য তাঁদের পুজোর পরিকল্পনায় বদল ঘটত। বাবা গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে। সারা রাত ধরে কলকাতার নামী পুজোমণ্ডপগুলি ঘুরে দেখতেন তাঁরা। একের পর এক মণ্ডপে প্রতিমা দর্শন, আলোর সাজ এবং শহরের উৎসবের পরিবেশ উপভোগ করাই ছিল সেই রাতের অন্যতম আকর্ষণ। তবে দশমীর দিন বিসর্জন দেখতে পাড়া ছেড়ে অন্য কোথাও যাওয়ার চল ছিল না তাঁদের। বিজয়া দশমীর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল আরও কিছু বিশেষ স্মৃতি। ঘুঘনি, নাড়ু এবং কুচো নিমকি খাওয়ার আনন্দ আজও ভুলতে পারেননি ব্রততী। প্রায় ২৫ থেকে ৩০ বছর আগের পাড়ার পরিবেশের কথাও মনে পড়ে তাঁর। তখন উৎসবের সময় প্রতিবেশীদের মধ্যে যোগাযোগ ছিল অনেক বেশি। বিজয়া দশমীতে একে অপরের বাড়িতে যাওয়া, কুশল বিনিময় এবং মিষ্টিমুখ করার মধ্য দিয়ে তৈরি হতো এক আন্তরিক সম্পর্ক।
সময়ের সঙ্গে সেই পরিচিত পরিবেশে অনেক পরিবর্তন এসেছে বলেই মনে করেন ব্রততী বন্দ্যোপাধ্যায়। আগে পুজোর সময় পাড়ার মানুষের মধ্যে যে মেলামেশা দেখা যেত, এখন তা অনেকটাই কমেছে। একে অপরের বাড়িতে যাওয়া কিংবা বিজয়ার শুভেচ্ছা জানাতে দীর্ঘ সময় কাটানোর অভ্যাসও আগের মতো নেই। বর্তমান সময়ের ব্যস্ততা এবং মানুষের জীবনযাপনের পরিবর্তনকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন তিনি। তবে পুজোর সময় কলকাতার বাইরে থাকলে তাঁর মন বারবার শহরের দিকেই ফিরে যায়। কাজের সূত্রে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ পান ব্রততী। সেই আমন্ত্রণ রক্ষা করতে গিয়ে অনেক সময় দুর্গাপুজোর দিনগুলিতে কলকাতার বাইরে থাকতে হয় তাঁকে। দেশের অন্য কোথাও থাকলে অন্তত একদিন পুজোর আনন্দে শামিল হওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। কিন্তু বিদেশে থাকলে পাড়ার পুজোর কথা আরও বেশি করে মনে পড়ে।
আরও পড়ুনঃ “মাকে সবটা জানিয়েছিলাম, কিন্তু সম্মানের কথা ভেবে চুপ করিয়ে দেয়!” “এরপরও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে থাকে, অস্ব’স্তিতে বমি করে ফেলেছিলাম” মাত্র ১০ বছর বয়সে কার হাতে যৌ*ন হেন’স্থার শিকার, পাননি কারোর সাহায্য? শৈশবেই ভয়ংকর অভিজ্ঞতা নিয়ে মুখ খুললেন ‘ডিজে মাউস’ ঝিলম গুপ্ত!
কলকাতার পুজোর ভিড়, রাতভর আড্ডা, ঢাকের আওয়াজ এবং ঢাকিদের নাচের ছবি যেন দূরে থাকলেও তাঁর মনে ভেসে ওঠে। কাঁসর ও ঘণ্টার শব্দও তাঁর কাছে পুজোর পরিচিত পরিবেশের অংশ। তাই পেশাগত কারণে শহরের বাইরে যেতে হলেও কলকাতার দুর্গাপুজোর সঙ্গে তাঁর আবেগের সম্পর্ক অটুট রয়েছে। ব্রততীর কথায়, দুর্গাপুজো বাঙালির কাছে এক গভীর অনুভূতির নাম। এই উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পরিবার, ছোটবেলার স্মৃতি, পাড়ার বন্ধন এবং একসঙ্গে আনন্দ করার অভিজ্ঞতা। সময় বদলেছে, মানুষের ব্যস্ততা বেড়েছে, বদলেছে উৎসব কাটানোর ধরনও। তবুও শৈশবের সেই পুজো, পরিবারের সঙ্গে কাটানো মুহূর্ত এবং কলকাতার চেনা পরিবেশ তাঁর মনে আজও সমানভাবে জায়গা করে রয়েছে। সেই কারণেই পুজোর সময় শহরের বাইরে থাকলে কলকাতার জন্য মন কাঁদে ব্রততী বন্দ্যোপাধ্যায়ের।






