“চারিদিকে ঢাক বাজছে…এবার আমার কোল শূন্য!” “ছেলেটা হাসতে হাসতে গেল, আর ফিরল না” “এই ভার আমি বইব কী করে?” ৭ মাসেও মেলেনি বিচার, রাহুল অরুণোদয়ের জন্মদিনে পুত্রহারা মায়ের চোখে জল! বাবিনের প্রিয় পায়েস আর সাপতা লুচির স্মৃতি আঁকড়ে কোন গল্প শোনালেন মা, শ্যামলী দেবী?

আজ ১৬ অক্টোবর, অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Rahul Arunoday Banerjee) জন্মদিন। এ বারই প্রথম জন্মদিনে তিনি নেই। বিজয়গড়ের সেই বাড়িতে এখনও সবকিছু আগের মতোই রয়েছে। সিঁড়িতে প্রিয় পরিচালকদের ছবি, দরজায় রাহুলের নামও রয়েছে। তবে বদলে গিয়েছে বাড়ির পরিবেশ, নেই আগের মতো পুজোর আনন্দ। ৪২ বছর বয়সে গত ২৯ মার্চ সমুদ্রের ধারে শুটিং করতে গিয়ে মৃত্যু হয় অভিনেতার। তার পর কেটে গিয়েছে বেশ কয়েক মাস, কিন্তু মায়ের কাছে সময় যেন এখনও থমকে আছে। এই প্রথম রাহুলকে ছাড়া জন্মদিন কাটাচ্ছেন তাঁর মা শ্যামলী বন্দ্যোপাধ্যায়।

রাহুলের মৃত্যুর পর সংবাদমাধ্যমের সামনে খুব বেশি কথা বলেননি তাঁর মা। তবে কাছের মানুষদের কাছে ছেলের কথা বলতে গিয়ে কিছুটা স্বস্তি খোঁজেন তিনি। এ দিন রাহুলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, অভিনেতার প্রিয় পোষ্য কুট্টুসও যেন তাঁর অপেক্ষায় রয়েছে। যে সোফায় বসে রাহুল একসময় সাক্ষাৎকার দিতেন, তার সামনেই এখন একা শুয়ে থাকে কুট্টুস। ছেলের ঘরে এখনও সাজানো রয়েছে একের পর এক বই, ট্রফি এবং নানা স্মৃতি। সেখানেই ছিল তাঁর পডকাস্ট ‘সহজ কথা’-র কাজের জায়গা। ঘরটি দেখাতে গিয়ে শ্যামলীর চোখ বারবার ভিজে ওঠে। ছেলের স্মৃতি আঁকড়ে বেঁচে থাকার কথাই জানান তিনি।

গত বছর রাহুলের জন্মদিনের স্মৃতিও এ দিন বারবার ফিরে আসে শ্যামলীর কথায়। সেবার হঠাৎ অনেক বন্ধুকে বাড়িতে নিমন্ত্রণ করেছিলেন রাহুল। মাকে বলেছিলেন, বন্ধুরা খেতে আসবে, তারপর সকলে মিলে বাড়িতে আনন্দ করেছিলেন। প্রতি বছর জন্মদিনে প্রিয়াঙ্কা সরকার এবং ছেলে সহজও আসতেন। গত বছর সহজের স্কুল ছিল পরের দিন বলে মা এবং ছেলে আগে চলে গিয়েছিল। রাতে মায়ের সঙ্গে বসে খাওয়া-দাওয়া করেছিলেন রাহুল। মাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তিনি খুব ক্লান্ত কি না। তার পর মায়ের কাছ থেকে ছোট বাচ্চার মতো আদরও নিয়েছিলেন অভিনেতা। সেই স্মৃতি মনে করেই এ বার শ্যামলীর মনে হচ্ছে, তাঁর কোল সত্যিই শূন্য।

রাহুলের খাবারের পছন্দের কথাও এ দিন জানিয়েছেন তাঁর মা। প্রতি বছর জন্মদিনে ছেলের জন্য পায়েস বানাতেন তিনি। রাহুল সেই পায়েস লুচি দিয়ে খেতে ভালবাসতেন। তবে সাধারণ লুচি নয়, তাঁর পছন্দ ছিল ‘সাপতা লুচি’। ছোটবেলা থেকেই এই ধরনের লুচির জন্য বায়না করতেন তিনি। কেন এমন লুচি চান জানতে চাইলে বলতেন, সত্যজিৎ রায়ও নাকি এমন লুচি খেতেন। ময়ান দেওয়া লুচি তাঁর একেবারেই পছন্দ ছিল না। বাড়ির খাবারের প্রতি তাঁর আলাদা টান ছিল, শুটিং বা অনুষ্ঠানে বাইরে থাকলেও রাতে বাড়ি ফিরে খেতেন।

ছেলের সঙ্গে কাটানো পুজোর দিনগুলিও এ বার বিশেষ ভাবে মনে পড়ছে শ্যামলীর। প্রতি বছর রাহুল তাঁদের সঙ্গে কেনাকাটা করতে যেতেন। এমনকি বাড়িতে থাকা একটি শাড়িও রাহুলের পছন্দ করে দেওয়া বলে জানিয়েছেন তাঁর মা। ছেলের সঙ্গে থাকলেই সারাদিন আনন্দে কেটে যেত বলে জানান তিনি। কখনও শুটিং থেকে ফিরে নারকেলের পায়েস বানানোর কথাও বলতেন রাহুল। আবার ডায়েট শুরু করলে নিজের হাতে নানা খাবার তৈরি করতেন। মানুষের সঙ্গে রাহুলের সহজে মিশে যাওয়ার স্বভাবের কথাও গর্ব করে বলেছেন শ্যামলী। সব্জি বিক্রেতা থেকে রিকশাচালক, সকলের সঙ্গেই তিনি স্বাভাবিক ভাবে কথা বলতেন এবং সম্পর্ক তৈরি করতেন।

আরও পড়ুনঃ “সেদিন হঠাৎ দু’জন এলো, ওঁদের দেখে প্রথমে কিছুই মনে হয়নি কিন্তু পরে যা ঘটল, তা আজও ভুলতে পারিনি!” “ঘটনাটা আজও আমার কাছে রহস্য!” তাঁরা কারা, তারপর কোথায় গেলেন? শৈশবের দুর্গাপুজোকে ঘিরে এক রহস্যময় ও অদ্ভুত স্মৃতি প্রকাশ্যে এনে আনলেন ভাস্বর চট্টোপাধ্যায়! শুনলে গায়ে কাঁটা দেবে!

রাহুলের বইয়ের প্রতি ভালোবাসাও মায়ের কথায় বারবার উঠে এসেছে। কেউ ১০০ টাকা দিলেও সেই টাকা দিয়ে বই কিনে ফেলতেন অভিনেতা। বাড়ি ফিরে সেই বই পড়তে বসে যেতেন, বই যেন তাঁর সবচেয়ে কাছের বন্ধু ছিল। রাহুল নিজের লেখা মাকে পড়তে দিতেন এবং মা না পড়লে অভিমান করতেন। এখনও তাঁর ঘরে সেই বই, লেখা, ট্রফি আর ব্যবহার করা জিনিসপত্র রয়ে গিয়েছে। রাহুলের পোষ্য কুট্টুসও গাড়ির দরজার শব্দ শুনলে ছুটে যায়, ভাবে হয়তো বাবিন ফিরেছে। সহজ বাবার ঘরে এসে বসে থাকলে শ্যামলী কিছুটা শান্তি পান, ছেলের মতো নাতির জন্য রান্নাও করেন। তবে প্রিয়াঙ্কা এবং সহজকে দেখলেও রাহুলের কথাই মনে পড়ে তাঁর। মায়ের কাছে এখন সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা নাতি, আর সবচেয়ে বড় কষ্ট সেই স্মৃতি যে, ছেলেটি হাসতে হাসতে শুটিংয়ে গিয়েছিল, কিন্তু আর বাড়ি ফেরেনি।

You cannot copy content of this page